বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৫

তুলসী বিবাহ

পূব আকাশের ধুসর চাঁদোয়ায় সবে লেগেছে ফাগুনের আবির,
পাতালরাজ্য সুষুপ্তির অন্ধকারে;
দীপের আলোয় জেগে উঠেছে শুধু একটি কক্ষ।
পাতালপুরীর রাজদেবালয়ে পূজোয় বসেছেন রানী বৃন্দা,
সম্মুখে শ্রীবিষ্ণুর স্বর্ণমূর্তি স্মিত আলোয় উদ্ভাসিত।
পরনে পবিত্র কাষায় বস্ত্র, অঙ্গে অলঙ্কার সামান্যই;
কপালে অলকা তিলক,রাজেন্দ্রাণীর সমাহিত রূপ শ্রদ্ধা জাগায়।
লঙ্কাপতির মামাতো ভগ্নি, কালনেমি পুত্রী, পাতালরাজ জলন্ধর মহিষী,
তবু বিষ্ণুসেবিকা এই পরিচয়েই তিনি ধন্যা।
ভক্তিতে একনিষ্ঠ, সতীত্বে উজ্জ্বল নারীশ্রেষ্ঠা সুন্দরী বৃন্দা –
রাক্ষসকুলে জন্মেও নারায়ণ কৃপাধন্যা;
পত্নীর সতীত্ব তেজে বলীয়ান অনার্য জলন্ধর ত্রিভুবনে অপরাজেয়।

পাতাল নৃপতি জলন্ধর মানতে চায়না আর্যকুলের শ্রেষ্ঠত্ব,
জন্মসূত্রে নয়, পুরুষাকারেই অর্জিত যে তাঁর সার্বভৌমত্ব;
অনার্য রাজার স্পর্ধায় বিস্মিত ইন্দ্র, সুরাসুর যুদ্ধ দেখা দেয় অনিবার্যরূপে।
যুদ্ধ অসম, তবু জয়ী হয় বীর জলন্ধর, নিজ বাহুবলে;
পরাজিত, ভীত, দেবকুল আশ্রয়প্রার্থী কৈলাসধামে, মহাদেব ভরসা তাঁদের।
যুদ্ধ শুরু হয় অসম্ভবের, দিবারাত্রি রনডঙ্কায় দশদিক প্রকম্পিত;
অটল নিজ বিশ্বাসে বৃন্দা সুন্দরী শুধু অবিচলিত –
বিষ্ণু আশীসে সে যে চিরায়ুষ্মতী।

উজ্জ্বল মশাল জ্বলে চতুষ্কোনে, দীপদন্ডে সহস্র মঙ্গলদীপ,
রাত্রি মধ্যযাম গত, তবু সুরলিত বিষ্ণুমন্ত্রে মুখরিত পুজাগৃহ;
অখন্ড উপাসনারত সতী বৃন্দা, বিজয়ী স্বামীর আগমনেই করবে আসন ত্যাগ।
‘প্রিয়ে’ অতিপরিচিত স্নেহ সম্বোধনে চোখ মেলে রানী, স্মিত হাসি জাগে ওষ্ঠাধরে,
সম্মুখে বিজয়ী জলন্ধর দুবাহু বাড়িয়ে, দীর্ঘ বিচ্ছেদ শেষে চোখদুটি মিলনে উন্মুখ।
প্রিয় বাহুপাশে কয়েক মুহূর্ত অনন্তকাল সম, ওষ্ঠাধর পুলকিত গভীর চুম্বনে,
আসঙ্গসুখে মুদে আসে আঁখি, অনুরাগে রাঙা মুখ প্রস্ফুট গোলাপ,
‘তুমি সুখী প্রিয়ে?’ গভীর প্রণয়ে চোখ মেলে চায় বৃন্দা স্বামী মুখপানে।
আচমকা গর্জায় মেঘ ডমরু নিনাদে, নিভে যায় মঙ্গলদীপ সহস্র বাতিদানে,
ক্ষনপ্রভা বিজুরী আলোকে আলিঙ্গনপাশে বেঁধেছে সতীকে কে ও?
‘বিষ্ণুদেব!’ আর্ত চিৎকারে কেঁদে ওঠে পরম সাধিকা,
জলন্ধর শির ছিন্ন হয় ত্রিশূল আঘাতে কৈলাস ধামে;
নিষ্ঠুর উল্লাসে মাতে স্বর্গলোক, জয়ী হয় দেবত্ব নারীত্বের চরম অপমানে।

‘তোমাকে পূজেছি চিরকাল কায়মনে, এই তার পুরষ্কার?’
পাষাণমূর্তি সম বৃন্দার আক্ষেপ বিচলিত করে পুরুষশ্রেষ্ঠকে,
‘জগৎ কল্যাণ হেতু দায়বদ্ধ আমি ক্ষমা কর দেবী’ -
আত্মপক্ষ সমর্থনের নির্লজ্জ প্রচেষ্টায় বিড়ম্বিত স্বয়ং নারায়ণ।
‘আমি সামান্যা রাক্ষসী, দেবী নই, ক্ষমায় অপারগ,
পাষাণ-হৃদয় হরি, আভিশাপে মোর পাষাণে আবদ্ধ হবে তুমি,
যে কলঙ্কের কালি মাখালে আমায় আজি, সেই ঘোর কালো লাগুক তোমার অঙ্গে,
বিরহ, লাঞ্ছনা যত দিয়েছ আমায়, পাবে শতগুণে তুমি মানব জনমে’।
মশাল আলোকে যজ্ঞাগ্নি জ্বেলে, ঝাঁপ দেয় লাঞ্ছিতা বিরহিণী,
সাক্ষী থাকে দেব চরাচর।

বৃন্দার চিতাভস্ম জ্বালায় তুষাগ্নি মহেশ্বরের কোমল অন্তরে,
পবিত্র তুলসী বৃক্ষে পায় প্রাণ সতী বৃন্দা তাঁরই আশীষে;
‘কলঙ্কিনী নয়,বিষ্ণুপ্রিয়া হবে তুমি তুলসী সুন্দরী’, জানান বিষ্ণু অতঃপর।    
শালিগ্রাম শিলা রূপী নারায়ণ সাথে তুলসী বিবাহ ঘটে কার্ত্তিক একাদশীতে,
নারীত্বের অমর্যাদাপাশে বাঁধা পরেছেন পুরুষোত্তম চিরতরে,
তাই কি আজও সম্বৎসর,ঘটে তাঁর কলঙ্কমোচন তুলসী বিবাহে?

***

@অনন্যা পাল ২০১৫

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৫

আশ্রয়

ঘরের লাগোয়া ব্যলকনিটা তার বড় প্রিয়।
সেই কোন ছেলেবেলায় বাবা মায়ের হাতধরে এই ফ্ল্যাটে উঠে আসা,
‘আজ থেকে এটাই আমাদের বাড়ি, আর এই ঘরটা তোমার’ –
কথাটা শেষ না হতেই, একছুটে পৌঁছে গেছিল নরম রোদ মাখা বারান্দাটায় ছোট্ট তিন্নি,
‘আর এটা?’ ‘এটাও তোমার’ বাবা হেসে কোঁকড়া চুলগুলো ঘেঁটে দিয়েছিলেন পরম আদরে।
সেই থেকে, বাড়ির এই বাড়তি কোনাটা তার একমুঠো আকাশ আর চিলতে রোদকে সঙ্গী করে
হয়ে ওঠে তিন্নির বড় আপনার,
একা একা এক্কাদোক্কা খেলা, গল্পের বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাওয়া;
আর তারও পরে, লাল বাঁধাই খাতায় কবিতার আঁকিবুঁকি  –
এর সবকিছুই যে ওই বারান্দার নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপে,
এই টুকরো জায়গাটুকু তার একান্ত নিজের,
যার ভাগ দেওয়া যায় না কাউকে।

রাস্তার ধারের কৃষ্ণচূড়া গাছটা ছায়া ফেলে বারান্দার রেলিঙে,
বাতাসে শুষ্কতার শিরশিরানি যেন আসন্ন শীতেরই পূর্বাভাস;
সামনের পার্কটাতে পাঁজরা বের করে দাঁড়িয়ে আছে প্যন্ডেলের কাঠামো
উৎসব শেষে, হত-গৌরব ভাঙা দেউলির মত।
গাছের ডালে বসা কাকটাকে হুড়ো দিতে গিয়ে হেসে ফেলে তিন্নি,
এই চুয়াল্লিশে এসব বোধহয় মানায় না;
মানায় না তো আরও কতকিছুই -
ব্যাবসায়ী স্বামীর সাফল্যের চেয়ে তার ব্যভীচারকে বড় করে দেখা,
ছেলেটার ভবিষ্যৎ না ভেবেই এক কাপড়ে তেজ দেখিয়ে বেরিয়ে আসা।
বুড়ো বাপ মার কাছে ফিরে এসে সেই বাড়িটায় ওঠা, যা সে নিজের বলেই জানত,
ভারি বেমানান সেটাও আজ সকলের চোখে।
একটা দীর্ঘশ্বাস বাতাস ভারী করে দেয় আচমকা,
খর হয়ে ওঠে কার্তিকের নরম সকাল।

একটু পরে আসবে কোন্নগরের পিসি ডাক্তার গৃহিণী মেয়ে নিয়ে,
উপলক্ষ বিজয়ার শিষ্টাচার,তবে লক্ষটা যে তিন্নি সেটা সহজবোধ্য;
স্কুলের সব পরীক্ষায় এগিয়ে থাকা তিন্নিকে পেছনে ফেলে,
লাল টিপ আর জামদানীতে ঝলমলে ছোট বোন এখন ডার্বি জেতা ঘোড়া;
গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠা কষ্টটাকে পেছনে ঠেলে দিতে গিয়ে ভেজে চোখ।
‘কা… কা…’ হেড়ে গলার হুঙ্কারে যুদ্ধের আহ্বান জাগিয়ে
প্রতিবাদী কাকটা রেলিঙে এসে বসে,
না চাইতেই ঠোঁটের কোন বেঁকে যায় হাসিতে,
কাকটার সাথে গলা মেলায় চুয়াল্লিশের তিন্নি,
ঝিরি ঝিরি বাতাসের দোলায় খসে পরে পাতা ঝুরো চুলের এলমেলো সিঁথিতে।
বারান্দাটা নতুন করে বড় কাছের মনে হয়,
শৈশবের স্বপ্নমাখা, নিশ্চিন্ত আশ্রয়।

***
অনন্যা পাল
৭ই অক্টোবর, ২০১৫

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

লুটের বাতাসা

মেয়ের বিদেশী স্কুলে কমিউনিটি সার্ভিস তথা নানা সমাজসেবামূলক কাজকর্ম হয়ে থাকে, সেসব কাজের জন্য অর্থের যোগাড়ও হয়ে থাকে বিভিন্ন উপায়ে; যথা নানান অনুষ্ঠান (ডান্স পার্টি, থিয়েটার ইত্যাদি), সর্বোপরি ‘সেল’ এ জামাকাপড় বিক্রি থেকে। এই ‘সেল’ ব্যপারটা ভারি জনপ্রিয় এবং প্রতিবারই নির্ধারিত দিনে অভিভাবকেরা যেরকম মরীয়া হয়ে সমাজসেবায় ছুটে আসেন, তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী।

আমরা তখন ঢাকায় সদ্য এসেছি, স্কুলে নতুন; খবর পেলাম এরকম একটি সেলের। মেয়ের সহপাঠিনীর মা, ভারী উপকারী, নিজে থেকেই উৎসাহ দিলেন, ‘দুশো টাকা রেটে ঢালাও প্যান্ট, জামা, ড্রেস, এমনকি গরম জামা পর্যন্ত; সব ভালো ভালো ব্রান্ডের’ আমাকে এর বেশী বলার প্রয়োজন হোলনা, সমাজসেবার মহৎ উদ্দেশ্যে ততক্ষণে আমি অদম্য। যাইহোক, নির্দিষ্ট দিনে সময়ের বেশ কিছু আগেই বেরিয়ে পরলাম নিমরাজি মেয়েকে বগল দাবা করে; ওকে সঙ্গে নেবার মুল উদ্দেশ্য ভীড়ের মাঝে বোঁচকা সামলানো, মুখে অবশ্য বললাম, ‘নিজে পছন্দ করে নিতে পারবে, ভালো হবে না?’ পৌঁছে দেখি হলের বন্ধ দরজার সামনে কাতারে কাতারে জন সমাবেশ; আকৃতি, প্রকৃতি, বর্ণ, জাতির বৈচিত্রে মিল শুধু একটাই, হাতে সকলেরই বড় বড় ঝোলা। বুঝলাম, এ বড় শক্ত ঠাঁই; ‘চোখ, কান খোলা রেখো’ মেয়েকে সতর্ক করে রেসের ঘোড়ার মত তেরিয়ে রইলাম দরজা খোলার অপেক্ষায়। এভাবে কাটল বেশ খানিক্ষন, স্বাভাবিক নিয়মেই একটু আলগা হয়েছে আমার তৎপরতা; অমনি আচমকা খুলে গেলো গুপ্তধনের গুহা। কিছু বোঝার আগেই প্রায় ভাসতে ভাসতে ঢুকে পড়লাম ভেতরে, ভাগ্যিস মেয়ের হাতটা ধরা ছিল তাই নিরুদ্দেশ ঘোষণার প্রয়োজন হোল না। তবে মুশকিল অন্য দিকে, ঢুকে তো পড়লাম, কিন্তু থামা দায়। এ টেবিল, ও টেবিল পেরিয়ে স্রোতে ভাসতে ভাসতে উপায় না দেখে শেষে একখানা টেবিল ক্লথ প্রানপনে খামচে ধরলাম। যাক, এবার থামা গেছে ভেবে সুস্থির হবার আগেই, ‘এক্সকিউস মি’ তীক্ষ্ণ হুংকারে চমকে দেখি, টেবিল ক্লথ নয়, আমি এক শ্বেতাঙ্গিনীর সাদা ফ্রকের কোনা চেপে ধরে আছি। কোনমতে ক্ষমা চেয়ে তেড়ে গেলাম সামনের টেবিলে ঢাঁই করে রাখা টিশার্টের দিকে।একটা বেগুনী টপ চোখে লাগল, হাত বাড়াতেই একটা থাবা নাকের ওপর দিয়ে সেটা উড়িয়ে নিয়ে গেলো; এরপরে লাল, সবুজ, কমলা তাক করেও কোনটাই কব্জা করতে পারছি না। এবার একটা লেসের কলার ওয়ালা নীলচে টিশার্ট নজরে আসতেই প্রানপনে চেপে ধরলাম, টানবার আগেই এক ছ-ফুটিয়া লালমুখো তার আর এক দিক চেপে ধরল। সেও ছাড়বে না, আমিও হয় এসপার নয় ওসপার; খানিক চলল এই টাগ অফ ওয়ার, শেষে আমার গোঁ দেখে সাহেব রণেভঙ্গ দিলো, জয়ের উল্লাসে আত্মহারা আমি খেয়াল করলাম না টানাটানিতে সাধের কলার ভীতু কুকুরের কানের মত ছেতরে গেছে। এভাবে যুদ্ধনীতি খানিক রপ্ত হতে ঠিক করলাম বাছাবাছি পরে, আগে যা পাই ওঠাতে হবে; এ ব্যাপারে দেখলাম মেয়ে আমার থেকে চৌকশ, মিনিট দশেকের মধ্যেই খান কুড়ি জামা কাপড় বাগিয়ে ফেলল। যা হোক বাছাবাছির সুযোগ নেই, তাই মোটামুটি আন্দাজে সাইজ দেখে নিয়ে কাপড়ের বান্ডিল জড়ো করে এগোলাম কাউন্টারের দিকে। ভল্যান্টিয়ার হিসেব কষছেন, তাতেও শান্তি নেই; এক ক্ষীণতটি পীতাঙ্গীনি (সম্ভবতঃ টেবিলে টেবিলে বিশেষ সুবিধে করতে না পেরে) ফিরতি পথে আমার সংগ্রহে হাত বাড়িয়েছেন। ‘এক্সকিউস মি’ এবারে আমি হুংকার দিলাম অনেকটা ‘সিংহাম’ স্টাইলে।    

ব্যাগ বোঝাই ও পকেট হালকা করে বাড়ি ফিরে সদর্পে পসরা খুলে বসলাম; উদ্দেশ্য আমার বিচারবুদ্ধির ওপর সম্পূর্ণ আস্থাহীন বাড়ির কর্তাটিকে তাক লাগিয়ে দেওয়া। প্রথমেই দুটো টপ বেরোল, একটা মেয়ের বছর দুয়েক আগেকার সাইজ, অন্যটাতে মা মেয়ে দুজনে একসাথে ঢুকে যাওয়া যাবে। এ ভাবে কোনটার বিটকেল আকৃতি, কোনটার বা উৎকট রঙ মোটের ওপর আমার মত অতি উৎসাহীর ও কাছাখোলা অবস্থা। ‘হরির লুটের বাতাসা, মন্দ কি!’ কথাটা হাওয়ায় উড়িয়ে আমার স্বল্পভাসী পতিদেব ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন; যেতে যেতে যে খিঁকখিঁকে হাসিটা উপহার দিয়ে গেলেন, মনে হোল একশটা ডেঁয়ো পিঁপড়ে একসাথে কামড়ে দিলো।   
  

***

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

উত্তর মেলেনি

প্রায় দুযুগ আগের কথা, হয়নি বেশিদিন বিয়ের;
ব্যস্ততার জীবনে হঠাৎ পাওয়া ছুটিতে দুজনেই উচ্ছ্বল -
ঠিক হোল যাব দীঘা, বাঙালীর আটপৌরে গন্তব্যস্থল।

দূরপাল্লার বাসে দিলাম পাড়ি,
হালকা শীতের আমেজে আসন্ন উৎসবের আভাস,
বয়সটাও ভালো লাগার;
ছুটির দুটো দিন পাখনা মেলে উড়ে গেল স্বপ্নের ঘোরে।

ফেরার দিন একটা সুখস্মৃতি, কিছুটা বিষন্নতা আর একরাশ ঝিনুকের গয়না ব্যাগবন্দী করে হাজির হলাম বাসস্ট্যান্ডে।
ছুটিফেরতা যাত্রিদের ভীড়ে জায়গাটা সরগরম,
টিকিট পেলাম বটে, তবে প্রায় পেছনের সীটে।
পছন্দের জানলার ধারে বসে, শেষবার দেখে নিচ্ছি বাইরেটা -
বাস ছাড়বার মুখে।

হঠাৎ একটা হৈচৈ, কিছু বোঝার আগেই বাসে উঠে পড়ল এক যুবতীসহ জনা চারেক যুবকের একটা ছোট দল।
শেষ মূহুর্ত্তের টিকিট, কন্ডাক্টর দেখিয়ে দেয় ইঞ্জিনের পাশের চিলতে বেঞ্চ -
বাস কর্মচারীর নির্ধারিত সীট, যা ভীড়ের দিনে যাত্রীদের শেষ ভরসা।
'এয়ার্কি আরকি, আমি বসবো এখানে?' মহিলার স্বরে অমার্জিত ঔদ্ধত্ব,
'আপনি লাস্ট সীটে চলুন, হয়ে যাবে যা হোক করে,
গোবেচারা কন্ডাক্টর আপোশ-উন্মুখ।

'আমি একা বসবো! এরা কি মাগনা উঠেছে বাসে?'
যুবতীর তিরষ্কার জাগিয়ে দেয় সঙ্গীদের পুরুষাকার অচিরেই;
ফলস্বরূপ সীটচ্যুত হয় শেষের সারির কয়েকজন,
এক বৃদ্ধ অসম্মতি জানিয়ে খান গলা ধাক্কা -
বাদ যায় না কন্ডাক্টার ও, সপাট চড় নেমে আসে তার গালে, বৃদ্ধের হেনস্থার প্রতিবাদের জেরে।
বাকী যাত্রীরা সমাহিত হয় নির্বেদ স্তব্ধতায়,
হয়ত ছাপোশা বাঙালীর এ এক অসহায় আত্মনির্যাতন।

বাস চলতে শুরু করে, তার সাথেই শুরু হয় পেছনের সীটে নির্লজ্জ প্রমদ-উল্লাস;
মক্ষীরানিকে ঘিরে চার যুবকের অমার্জিত কথাবার্তায় শিউরে উঠি,
মননিবেশ করি পথসঙ্গী হাতের বইটিতে।

কোলকাতা আসতে আর নেই বেশী দেরী, বাস থামল একটি পেট্রল পাম্পে;
ট্যাঙ্কে ইন্ধনপূর্তী, সাথে ক্ষনিক জলপানের বিরতি।
সকলেই প্রায় নেমেছে বাস থেকে, জল না হোক খোলা বাতাসই বা কম কি?
নেমেছে যুবতীর তিনসঙ্গী,
থেকে গেছে একজন, বুঝিবা একাকী সঙ্গলোভে।

আলগোছে জানলায় হাতরেখে চোখ রাখি সিঁদূরী আকাশে,
অস্তরাগের আভায় ছলকে ওঠে আমার তরুণ মন।
আচমকা কাঁচের পাল্লাটা ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতের আঙুলে,
প্রচন্ড ব্যাথায় সরিয়ে আনি হাত,
চোখে জল আসে তীব্র আঘাতে।
'জানলাটা বন্ধ করলি কেন?' যুবক ধমকে ওঠে ক্ষনপূর্বের প্রণয়িনীকে,
তার কর্কশতায় থমকে যায় উদ্ধত যুবতী।

'খুব লেগেছে আপনার? একটু জল দেবেন হাতে?' প্রশ্নটা আমাকে,
যুবকের প্রশ্নে স্পষ্ট উদ্বেগ, কোমল ব্যঞ্জনায় আফসোসের ছোঁয়া।
বিস্ময়ে বাক্যহারা আমি মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাই।
বাকি রাস্তা মেয়েটি নিশ্চুপ,
আমার মনেও বিস্মিত জিজ্ঞাসা।

এরপর কেটে গেছে বহূকাল,
জীবনের পরোতে পরোতে জমেছে অভিজ্ঞতার পলি;
তবু সেদিনের অসঙ্গতির  আজ ও উত্তর মেলেনি।

***

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

প্রতীক্ষা

ছোট্ট বুক রোমাঞ্চে দুরুদুরু,
গ্রীলের ফাঁক দিয়ে চেয়ে আছে দুটি সরল চোখ অসীম আশায়;
পুজোর আর কটা দিন বাকি -
অফিস ফেরতা পথে বাবা আনবেন পুজোবার্ষিকী।

গরমের ছুটির নির্জন দুপুরে,
দরজায় কান পেতে থাকা পিওন কাকুর অপেক্ষায়,
আসবে কি আজ চিঠি প্রিয় বান্ধবীর -
কিশোরী মনের উচ্ছাস  যার পাতায় পাতায়?

ফোনের আওয়াজ কানে যেতেই পাদুটো বশে থাকেনা আর,
দৌড়ে গিয়ে রিসিভার তুলে 'হ্যালো'?
এটা মেজমাসী, ফোনটা মায়ের;
পরেরটা ঘোষ কাকু, দরকার বাবার সাথে,
আসে পড়ুয়া বন্ধুর ফোন, অথবা নেহাৎ গল্প বিলাসী।
আশা নিরাশার দোলচালে তবু চলে অনন্ত প্রতীক্ষা,
আজো কি যাবে না শোনা সেই চেনা ডাক - পরবাসীর?


শ্রাবণ ঘন সন্ধ্যা, বাইরে মনকেমন করা চাপচাপ অন্ধকার;
মনের উচ্ছ্বাস তবু বাঁধ মানেনা আর,
বহুদিন পরে আসছে মেয়েটা,
গাড়ীর আওয়াজ হলো কি - এত দেরী কেন?
সময়ের হিসেব হারায় আমার মাতৃহৃদয়ের অধীরতা।


রাত্রি নিশুত, বিছানার পাশে বসে আয়া মেয়েটি ঢুলছে,
আজ কি পূর্ণিমা? রূপোলি জোছনা, জানলার পর্দাকে ফাঁকি দিয়ে আলতো ছুঁয়ে আছে আমায়;
কি শান্তি! এখনো কি হয়নি সময়?
আমি যে পথচেয়ে আছি প্রিয়তম -
চিরমিলনের আশে এ আমার শেষ  প্রতীক্ষা।


@ananyapal2015

শনিবার, ২৭ জুন, ২০১৫

ঘরে ফেরা


স্বপ্নের নগরী ছেড়ে ফিরলাম ঘরে, আজ বেশ কয়েকদিন পরে;
সেখানে সীমাহীন সমুদ্রের নীল, আমার ছাপোষা মনে তুলেছিলো ঢেউ,
নীলিমার কোলজুড়ে সাদা পাহাড়ের ঘেরাটোপ, তারই আড়ালে চাঁদ- সূর্যের লুকোচুরি - সেও যে অনেক দামী।
সাথে ছিলো মায়াবী রূপকথার নরম জোছনা, অতীতের বিস্ময়্কীর্তীর ছড়ানো মানিক অলিতে গলিতে করেছিলো আনমনা।
ফেরার বেলায় বুকের গভীরে একটা হালকা মোচড়, দিয়েছিলো মন খারাপের বার্তা;
দীর্ঘ বিমানযাত্রা ক্লান্তিকর, যেন মোচড়টা বাড়িয়েছিলো আরো।


বিমানবন্দরের হাঁসফেঁশে তদ্বির - ব্যস্ততা পেরিয়ে কোনোক্রমে বাড়িমুখো;
সেখানেও জ্যামের ঠেলাঠেলি, অগ্রগতির পার্শ্বচাপ।

সদর দরজা খুলে লটবহরের হ্যাপা সামলে ঢুকলাম বসার ঘরে,
একটা সোঁদা গন্ধ বয়ে আনলো বদ্ধতার আভাস -
তড়িঘড়ি পর্দা সরাই, খুলে দিই বারান্দার কপাট।

বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, গাছের পাতায় নরম সবুজের সমারোহ,
ঝিলের জল পূর্নগর্ভা বধূ।
চারদিকের ভিজে সতেজতা বড় সহজ, বড় নিজের মনে হয় নিমেষেই।
স্বপ্ন নগরী তুমি থাকবে আমার স্বপ্নে, মধুর লালিমা নিয়ে;
আজ চেনা গন্ডির স্বস্তিতে চলুক আমার ঘরে ফেরার উৎসব।


ঢাকা
২৭শে জুন, ২০১৫


শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০১৫

নীলচে বিকেল


ধুসর মেঘের ঘনঘটা ছায়া ফেলেছে ছোট ছোট ঢেউয়ের নীলিমায়,
সময় থেমে গেছে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপের বাঁধানো সমুদ্রপটে; 
তুমি আমি বসে আছি নির্জন বেঞ্চে, সামনে দীগন্তে সমুদ্র ও আকাশ পথ হারা।

প্রাক-সন্ধ্যের মায়াবী বিকেল, আকাশের ধুসরতা আর সমুদ্রের নীলিমায় অদ্ভুত নীলচে।
সময়ের হিসেব হারিয়ে হিসেবী মন আজ ভাষা হারা,
তবু কত কথা বলা হয়ে যায় - 
যা ছিলো না-বলা এতোকাল।

ধীরে ধীরে মেঘের দেয়াল চিড়ে নেমে আসে আলোর ঝর্ণা, মহাকালের আশীর্ব্বাদ নিয়ে;
সেই স্বর্গীয় আভায় নতুন করে তোমাকে দেখি, 
যে দেখা হয়েছ্লি শেষ বহুকাল আগে সময়ের দৌড়ে।

তবে কি ছিলাম অপেক্ষায় এমনি এক নীলচে বিকেলের,
যে রেখে যাবে বসন্তের ছাপ খর গ্রীষ্মের দিনে?


***

ন্যাপফ্লিও, গ্রীস
১৮ ই জুন, ২০১৫