বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

পিরীতি বিষম জ্বালা

প্রেমে পরাটা বাঙ্গালীদের একটা বাতিকের মত, বিভিন্ন বয়সে একেক রকম ভাবে দেখা দেয় । যেমন স্কুলে পরতে ভীতুভীতু প্রেম, আবার কলেজ জীবনে কবিতা লেখার তাগিদে মরীয়া প্রেম। তাছাড়া ধরুন, পাশের বাড়ির নতুন ভাড়াটেদের সুন্দরী মেয়েটিকে দেখে জানলার পাশে ঘাঁই দিয়ে বসে উদাসী প্রেম; অথবা বাস স্ট্যান্ডে রোজ দেখা মেয়েটির পিছু নিয়ে তার বাড়ী অবধি ধাওয়া করে দুরন্ত প্রেম এব্যাপারে আপামোর বাঙ্গালিরই কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা থাকতে বাধ্য, তার কিছু টক, কিছু মিষ্টি আর কারো কারো কপালে হয়ত শুধুই তেঁতো । তবে একথা স্বীকার করতে বাধা নেই যে আমার প্রেম বিষয়ক অভিজ্ঞতা শুধু অপূর্ব নয় সম্ভবতঃ অভূতপূর্বও এবং যতরকম প্রেম বাঙ্গালির সহজাত তার প্রায় প্রত্যেকটিই আমার ঝুলিতে বর্তমান 
একেবারে গোড়া থেকে শুরু করলে ব্যাপারটা বেশ ফরসা হবে। তখন পড়ি ক্লাস সেভেনে, আমার প্রিয় বান্ধবী গরমের ছুটিতে মামাবাড়ি গিয়ে প্রেমে পরলেন। প্রেমে তো শুধু পরলেই হয়না তাকে জল-সার দিয়ে টিঁকিয়ে রাখাও চাই; আর সমস্যাটা বাধল সেখানেই। কারণ মামাবাড়ি কোলকাতার বাইরে, পত্রালাপ ছাড়া গতি নেই। এদিকে বাড়িতে চিঠি এলে ধরা পরার ভয়। অতএব অগতির গতি এই শর্মা, বন্ধুর প্রেমকে মসৃণ করার মহৎ কাজে তখন আমাকে ঠেকানো দায়। নিজের বাড়িতে চোরের মত পরের চিঠির আশায় ওঁত্ পেতে থাকি, আর কাঙ্খিত সুগন্ধি রঙিন খামটি এলেই চিলের মত ছোঁ মারি পিওনের কাছ থেকে। এভাবে চলছিলো বেশ (অন্তত আমার বন্ধুর হাবেভাবে তো তাই মনে হোতো), বিপদ এল অন্য দিক থেকে। এক রোববার একটা ফোন আসার পরই বাবা গম্ভীর মুখে ডেকে জানতে চাইলেন কবে থেকে পরের কালোয়াতিতে পোঁ দিচ্ছি (ভাষাটা এক না হলেও বক্তব্যটা প্রায় তাই ছিল)? ‘প্রাণ যায় পর বচন না যায়’ কায়দায় চুপ করে থেকে সেদিন দুর্গতির একশেষ, অন্ততঃ বামাল সমেত ধরা পরা বান্ধিবীর থেকে তো কম নয়ই। যাই হোক এর পর বান্ধবীর প্রেমরোগ তো সারল, কিন্তু আমার?
আমার পোঁ দেওয়ার সেই শুরু, বান্ধবীদের হয়ে অর্ডারি প্রেমের-চিঠি লেখা এবং তার জবাব এলে আরও জুতসই একটা প্রত্যুত্তর দেওয়া আমার সাহিত্যচর্চার (যা কিনা বাঙ্গালির আর একটা বাতিক) একটা গুরুতর অঙ্গ হোল; অবশ্য এব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে গাছে ওঠাতে বন্ধুরা কোনও ত্রুটি রাখেনি। তবে আমার সাহিত্যকীর্তি অন্য মাত্রা পেল বেশ কিছুদিন পরে। এক বান্ধবী তার অর্ডারি চিঠি আমার থেকে নিয়ে গিয়ে কপি না করে সিধা পাঠিয়ে দিতে লাগলো প্রেমিক প্রবরকে (প্রেমের ব্যাস্ততায় নষ্ট করার মত সময় কোথায়?)একদিন সেও চিঠি পাঠানোর আগেই বামাল সমেত গ্রেপ্তার; এক্ষেত্রে গোয়েন্দাটি তার দিদিচিঠিতে আমার ভুবনমোহিনী হাতেরলেখা চিনতে ভুল হবার নয় আর তা হোলও না। ফলে সেবার প্রানের সাথে কান নিয়েও জবর টানাটানি।  
এবার আসি কলেজ প্রেমের কথায়। তখন সবে ফার্স্ট ইয়ার, এক শীতের সকালে আমার বেস্টফ্রেন্ড (বন্ধু, বান্ধবী নয়) হন্তদন্ত হোয়ে টেনে নিয়ে গেলো লেডিস কমন রুমের সামনে। ‘ব্যাপার কি?’ আমি খানিক ভ্যাবাচ্যাকা। ‘নন্দিনী এখুনি ঢুকেছে, আমি দেখেছি’ বন্ধুর ধোঁয়াটে জবাব। ‘তাতে আমাদের কি?’ ‘আরে অনেক কিছু। শিগগিরই গিয়ে আমার নাম করে ফোন নম্বরটা চেয়ে নে’। ‘আমি কেন নিজে নে না’ আমার সরব প্রতিবাদ। ‘আরে গাধা লেডিস রুমে আমি ঢুকলে সবাই মিলে চামড়া গুটিয়ে নেবে না?’ বন্ধুর যুক্তি অকাট্য, কদিন আগে আমিই এহেন ঘটনার সাক্ষী ছিলাম (বেচারা নতুন পড়ুয়াটি পাশের টিচার্স রুমের সাথে গুলিয়ে ফেলেছিল)। আমি এরপরেও গাঁইগুঁই করছি, প্রধানতঃ নন্দিনীর ডাকসাইটে উন্নাসিকতার কারণে। ‘ইয়ে ইশক নেহি আসান,এক আগ কা দরিয়া হ্যায়, অউর ডুবকে জানা হ্যায়’ বন্ধু গর্জে উঠল। ‘কিন্তু ইশক তো তোর, আগুনের সমুদ্রে আমি কেন?’ আমার মিনমিনে জবাবের তোয়াক্কা না করে আমাকে ও প্রায় ঠেলে চালান করে দিলো ভেতরে, শুধু তাই নয় দরজার সামনে পাহারায় রইলো যাতে পালিয়ে যেতে না পারি। নিজের বন্ধুভাগ্যে এতদিন পরেও আমি নিজেই রোমাঞ্চিত।
‘হাই! আমি সেকশান-এ’। ‘জানা আছে, নন্দিনীর কাঠখোট্টা জবাব। আমি আরেকটু ঘন হবার জন্যে দুএকটা কথা বলি যা নিজের কানেই অত্যন্ত বোকাবোকা ঠেকে। নন্দিনী আমাকে ঝেড়ে ফেলে মন দেয় নিজের সাজসজ্জার দিকে। ‘তুমি সুমন্তকে চেনতো? তোমাদের সেক্সানের’। আমি প্রসঙ্গে আসার জন্যে মরীয়া। ‘হু কেয়ারস্’! ‘না মানে ও তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়’। ‘কিন্তু আমি চাইনা’। ‘কেন? ও কিন্তু খুব ভালো ছেলে’। সুপারিশের উত্তরে আমার পেছনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে নন্দিনীর জবাব, ‘ভালো মানে তো ক্যাবলা, না হলে এধরনের প্রিমিটিভ ফ্রেন্ড জোটায়’। কানে আগুন, চোখে জল নিয়ে আমি কমন রুমের বাইরে

নিজের ইশক আসান কিনা জানিনা, তবে বন্ধুর ইশক যে পুরোপুরি আগুনের সমুদ্র তা আমার চেয়ে কেউ বেশি জানে না।

***

মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ফিরে দেখা

একটা ছোট্ট মেসেজ হোয়াটস আপে, ‘কবে আসবি, তোকে বড় দেখতে ইচ্ছে করে’ -
বদলে দিলো আমার ব্যাস্ততার সকাল এক লহমায়;
আছি কারো মনে, এই ভাবনায় আটপৌরে আমি কেমন নতুন হলাম নিজের কাছেই ,
শুরু হোল দিন গোনা । 
ফ্লাইট দমদমের মাটি ছোঁয়া থেকেই বুকের ভেতর ধুকপুক  –
‘দেখা হবে তো?’
 কেজো ছুটোছুটি, বিরামহীন দায়বদ্ধতা;
তবু তারই মাঝে কয়েকটা মেসেজ আর রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা ।

নতুন গড়ে ওঠা মাল্টিপ্লেক্সের প্রবেশদ্বারে পৌঁছে গেছি বেশ খানিক আগেই,
কিছু উদ্বেগ, কিছুটা রোমাঞ্চ মনে করিয়ে দেয় সেই প্রথম যৌবন;
চিনতে পারব তো, আমাকে চিনবে তো? - কত না সংশয়;
অনেক ভিড়ের মাঝে কয়েকটা চেনামুখ, মুহূর্তে শুরু টাইম মেশিনের সফর ।
অনাবিল হাসি আর অফুরান কথায় ভরা কয়েক ঘণ্টা পার হয় পলকেই;
স্মৃতির রোমন্থনে ফিরে দেখা সেই কবেকার ছোটবেলা –
বড় মধুর, স্বপ্নময় ।

‘দেখা হবে আবার’ বেলা শেষের প্রতিশ্রুতি  নয় কোনও বিদায় সম্ভাষণ;
একে অন্যের প্রতি এ যেন প্রানের অঙ্গীকার ।
ফিরে দেখার সেই বিকেল ঝুলিতে ভরে দিলো অনেক কিছু  –
জানি সে যে ফুরোবার নয় ।।


***

বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৪

মিলন রাতি

ঝরোখার কিনারে বসে আনমনা রূপসী ,
ঈষৎ বেঁকানো গ্রীবায় এলো খোঁপা খানি,
গোধূলির লালিমায় রেঙেছে চিবুক -
সিঁথির কুঙ্কুম যেন পদ্মরাগ মণি
চকিত চঞ্চল তার কালো দুটি আঁখি,
মধুর আবেশে মগ্ন কোন সে স্বপনে -
থেকে থেকে ফিরে চায় কোন সে আশায়?
রাজঅন্তঃপুরবাসিনী কিশোরী কমলা,
রাওয়াল কুমার তিলস্কির নবপরিণীতা ।

সেদিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা,
বেজেছিল মঙ্গল শঙ্খ, নহবতে বেহাগের সুর, 
নিভৃত বাসরে বেলা চামেলির সুরভি মধুর ।
‘এ কোন চাঁদ চাঁদনীকে মানায়  হার?’
অস্ফুটে শুধান কুমার
ওড়নির আড়ালে লজ্জায় থিরথির
কিশোরী কমলা, নবপরিণীতা রাজবধু  ।

নিভৃত বাসরে গর্জে ওঠে রনভেরি -
ফিরোজ শাহের সেনারা ঘিরেছে মরুদুর্গের দেউড়ি,
‘বিদায় দাও প্রিয়ে, যেতে হবে আজি ডেকেছে মাতৃভূমি’ ।
বরবেশ ছেড়ে বীরবেশে সাজে তিলস্কি রাওয়াল;
স্বামীকে রণটিকা পরায় কমলা,
ঠোঁটে আধো হাসি চোখে ভরা দীঘি টলমল ।
গভীর আবেশে হাতে হাত রেখে বলেন কুমার,
‘বাসর শয্যা থাকুক পাতা, ফিরব রানি,
তোমায় আমায় পূর্ণ হবে মিলন রাতি’ ।

ঝরোখার পাশে আঁখি মেলে বসে কিশোরী বধূ
বাসর শয্যা তেমনই পাতা, ফুল শুকিয়েছে শুধু ।
হাল্কা পায়ের আওয়াজে কমলা চমকে চায়
এই বুঝি দাসী আনল খবর, আসছেন স্বামী তার ।
দাসী নয় রানী রাজসি দেই -
‘সাজ বধূ আজ রাঙা চেলী আর ফুলসাজে
বাসর তোমার সফল হবে আজ রাতে’ ।
নতুন বসন, ফুল আভরন গলায় যূথীর মালা
শ্বেত চন্দন রাঙা কুঙ্কুমে অপরূপা কমলা ।
আকাশের চাঁদ আজও আছে সাথে, আছে সেই মধুরাত
ফুলডোর নয় অঙ্গার আজ সাজাল বাসর তার ।
যবন নিধনে রাজপুত বীর সাকা বেঁধেছে মাথে,
পুরনারী সব জহর আগুনে মরণ খেলায় মাতে ।
কুমারের পাগ বুকে নিয়ে বধূ আগুনকে করে সাথী
অবশেষে তার পূর্ণ হোল মহা মিলন রাতি ।।

পরিশিষ্টঃ দিল্লীশ্বর ফিরোজ শাহ্‌ তুঘলকের আক্রমন রুখতে জয়সলমির দুর্গে সাকা অর্থাৎ মাথায় গেরুয়া কাপড় বেঁধে মৃত্যুপণ করে যুদ্ধ করেছিলেন ১৭০০ রাজপুত আর জহরের আগুনে প্রাণ দিয়েছিলেন ১৬০০০ পুরনারী । যুদ্ধে রাওয়াল ডুডোজি ও কুমার তুলস্কির মৃত্যু হয় । এই কবিতার প্রেক্ষাপট এই ঐতিহাসিক ঘটনার ভিত্তিতেই । কবিতার কুমার তিলস্কি ও রানি রাজসি (রাওয়াল ডুডোজির মহিষী) ঐতিহাসিক চরিত্র, কমলা আমার কল্পনা প্রসূতা ।


বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০১৪

মানে না মানা

‘রাগ করেছো?’ মোবাইলে মেসেজটা দেখে ভাবতে বসলাম কাকে কাকে দুএকদিনের মধ্যে দাঁত খিঁচিয়েছি । ‘জবাব দিচ্ছনা যে, এতো রাগ!’ ‘আচ্ছা আমি নাহয় মাফ চাইছি হোল তো?’ এযে মেঘ না চাইতেই জল! শেষ কবে কেউ এমন মিষ্টি করে আমার রাগ ভাঙিয়েছে মনেই পরে না (বাড়িতে বাকিদের মানভঞ্জনের মনপলি আমারই কিনা) । ভাবছি জবাবে কি লিখি, এরমধ্যেই আরেকটা মেসেজ, ‘নীপা প্লিজ কিছু বল’ । যাক এতক্ষণে সব ফরসা হোল, মেসেজ গুলো নীপা নাম্নী এক সৌভাগ্যবতীর; মানে যার রাগ অন্ততঃ একজনের কাছেও ভারি দামী । বেচারি প্রেমিকের জন্যে প্রাণটা কেমন হুহু করে উঠল, জবাবে লিখলাম, ‘আমি তো নীপা নই, আপনার বোধহয় কিছু ভুল হয়েছে’ ।  ‘ভুল তো হোয়েছেই, আর সেতো আমি স্মীকার করছি, তাবোলে আমাকে এড়াতে বলে দিলে তুমি নীপা নও!’ ‘না না বিশ্বাস করুন আমি সত্যি নীপা নই, নীপা নামের কাউকে চিনিও না’ । ‘নীপা তুমি যদি বারবার এরকম বল আমি কিন্তু ঠিক একটা কিছু করে বসবো!’ আমি আতঁকে উঠি, শেষে কি আত্মহত্যার প্ররোচনায় জেলে যাবো! মেসেজের অভিমানী হুমকি সমানে চলছে; অনেক ভেবে মেসেজ করলাম, ‘বেশ তবে আমাদের বাড়িতে এসে যা বলার বল, আমি শুনবো’ । ভাবলাম, মোবাইল নম্বর ভুল হয়েছে বলে বাড়ির নম্বর তো আর ভুল হবে না, ফলে সমস্যা মিটবে । ‘নীপা সত্যি বাড়িতে ডাকছ? কোন গোলমাল হবে না তো?’ ‘না না গোলমাল কিসের, তুমি বাড়ির সামনে এসে একটু দাঁড়াও, ঠিক একটা ব্যবস্থা হবে’ আমি স্বান্তনা দিই । ‘বেশ তবে আসছি, ঠিক দশ মিনিটে বারান্দায় এসো আমায় দেখতে পাবে’ ।

খানিক পরে আবার মেসেজের গুঁতো, ‘কি হোল, বারান্দায় এসো, দেখ তোমার পছন্দের লাল টিশার্টটা পরেছি’ । এবার আর জবাব দিলাম না ।  সবে বিকেলের চা টা নিয়ে বসেছি, বাইরে থেকে ক্রিকেট বল এসে পরল বসার ঘরে; আজকাল এই এক জ্বালাতন পাড়ার হবু শচিন দের নিয়ে । রাগ করে বলটা বাইরে ফেলতে বারান্দায় গিয়ে আমি থ; লাল টিশার্ট পরা এক রোমিও জুলুজুলু চোখে চেয়ে আছে আমাদের বিল্ডিঙের দিকে । তেল সাবান না জোটা লম্বা চুল, গালে খোঁচা দাড়ি বছর পঁচিশের এক ছোকরা; আগে কোনদিন দেখেছি বলে মনে পরে না । কি বিপদ, শেষে মেসেজগুলো কি আমাকেই করেছিল নাকি? আমার সন্দীপা নামটাকেই ছোটো করে নীপা; মাথা একেবারে ঝিম ঝিম, ভেতরে এসে সোফায় বসলাম কোনমতে । প্রেম অন্ধ একথা অনস্বীকার্য, তাবোলে দেড়া বয়সের এক খিটকেল মহিলা! ছোকরার পছন্দের মাথামুণ্ডু পেলামনা, এদিকে চা জুড়িয়ে ঠাণ্ডা । এরমধ্যে বেলটা বেজে উঠল, কি জানি ছোঁড়ার এতো সাহস শেষে ফ্ল্যাটে হানা! ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দেখি বীথি, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম । বীথি আমাদের নীচের ফ্ল্যাটে থাকে, মাস কমুনিকেসনে মাস্টার্স করছে, ভারি মিষ্টি মেয়ে; বউদি বলে ডাকে, মাঝে মাঝে গল্প করতে আসে আমার সাথে । সকালে ও আমার একটা শাড়ী নিয়েছিল, কলেজের কোন অনুষ্ঠানে পরবে বলে, বুঝলাম ফেরত দিতে এসেছে, ‘এতো তাড়া কিছু ছিলনা বীথি’ আমি ভদ্রতা করি । ‘তাড়া ছিল বইকি বউদি, দাদার ফোনটা আসায় দৌড়ে এলাম ফেরত দিতে’ । মাথাটা গুলিয়ে গেলো, ওকে ভেতরে আসতে বলে বসে পরলাম । ‘দাদা ফোন করে শাড়ী ফেরত দিতে বলল’? ‘ধ্যাৎ, কিযে বল; শাড়ী নয় এটা ফেরত দিতে এসেছি’ ও নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিলো । ‘মানে?’ আমি হতচকিত । আরে সকালে গল্পের চোটে ভুলে তোমারটা নিয়ে গেছিলাম, এখন দাদার ফোনটা পেয়ে বুঝতে পারলাম’ । আমাদের দুজনের মোবাইলের মডেল এক, অতঃপর......... এতক্ষণে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল । ‘আমারও তোমাকে কিছু ফেরত দেবার আছে নীপবীথি’ । ‘কি?’ ‘সেটা বারান্দায় গিয়ে দেখ নীপা’ আমি হেসে বলি ।


***
Published in Prothom Alo on 21st March, 2016

বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

দাদাগিরি

এমনিতেই আমার মাথাগরম বলে বদনাম, তার ওপর রীতিমত চর্চা করা তাগড়া চেহারা; লোকে আমায় বিশেষ ঘাঁটায় না । পাড়ার ভালো মন্দের দায়, ছেলে ছোকরাদের ওপর নজরদারি, সে একরকম আমি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করি; তাতে মাঝে মধ্যে একে ওকে একটু কড়কাতে হলে কি বা এসে যায়! তবে আজ সকাল থেকেই বিলের কাণ্ড দেখে মেজাজ আমার সপ্তমে, এর একটা শেষ না দেখে আমি আর ছাড়ছি না । বেশ কিছুদিন ধরেই ঘোষ বাড়ীতে ওর চুপি চুপি যাতায়াত আমি লক্ষ করেছি, মিয়াঁ বিবি যখন কাজে যায় তখনই বেটা উঁকি ঝুঁকি মারে খিড়কির দরজা, নয় রান্নাঘরের জানলা দিয়ে । কার সায়ে এসব চলছে তাও বুঝি; গেলো মাসে ভালবেসে ও বাড়ির মিনিকে একটা ফিস ফ্রাই খাওয়াতে চেয়েছিলাম । তা দোকান থেকে বাগিয়ে আনতে একটু ঠাণ্ডা হয়ে গেছিল আরকি, অমনি মুখ ঝামটে বলল ‘বাসি খাবার আমি খাই না!’ আর এই ছিঁচকে বিলে, তার ওপর কি দরদ!

আজ তিতলিদির জন্মদিন, ঘোষ বাড়িতে হেভি খাওয়া দাওয়া, পাড়াশুদ্ধু লোকের নেমন্তন্ন; আমিও যাবো, তবে একেবারে শেষের দিকে, নেমন্তন্নের ধার আমি ধারি না । তাই তো বিলেটাকে সন্দেহ, আমি তো জানি ব্যাটা চুরি বিদ্যেয় এরই মধ্যে হাত পাকিয়েছে, নির্ঘাত লোকের ভিড়ে হাতসাফাইয়ের তালে আছে । আর চুরির দোসর যখন ঘরেই মজুত তখন আর পায় কে! কিন্তু আমি থাকতে সেটি হতে দিচ্ছিনা, তক্কে তক্কে আছি, আজ হাতে নাতে ধরে ওকে পাড়া ছাড়া করে তবে আমার শান্তি ।

বাড়ির ভেতর থেকে মাছের কালিয়া আর ভেটকির পাতুরির গন্ধে রাগটা প্রায় গলে যাবার জোগাড়, কিন্তু না, কর্তব্যে অবহেলা এ শর্মা করে না, তাই না পাড়ায় আমার এতো খাতির! যাইহোক, দিপুদের পাঁচিলের আড় থেকে আমি ঠিকই নজর রাখছি হতচ্ছাড়া বিলের ওপর । লোকজন বেশ কিছু আসতে শুরু করেছে, মিনি ঢঙ করে তিতলিদির সাথে সাথে ঘুরছে, যেন জন্মদিনটা আজ ওরই! খাওয়ার আসরে হাঁকডাক বাড়ছে, ঠাকুর সামাল দিতে নিজেই পরিবেশনে হাত লাগিয়েছে; এই মওকায় বিলে একলাফে বাড়ির ভেতর, আর যায় কোথায় আমিও মারলাম এক লাফ, একেবারে বিলের ঘাড়ে । দুজনে গড়াতে গড়াতে রান্নাঘরের দরজায়, গায়ের জোরে ব্যাটা নেহাত কম যায় না, সঙ্গে তেমনি গলার জোর, জাপটাজাপটি, গর্জন; আজ কেউ একপা পিছব না, যা থাকে কপালে । ‘আ মল যা, এদুটো আবার ঠিক জুটেছে! মাছের গন্ধ পেয়েছে কি হতচ্ছাড়াদের দৌরাত্ব শুরু । ফেলে দিয়ে আয় তো ন্যাপা দুটোর ঘেঁটি ধরে!’ ন্যাপার ঠাকুমার খোনা গলার চিৎকার কানে যেতে না যেতেই ‘ঝপাস!’ কে যেন খামচে নিয়ে চুবিয়ে দিলো ড্রেনের জলে । অপমানে চোখে জল এলো, এই দুনিয়ায় ভালো কারো করতে নেই । এতো যে নিঃস্বার্থে পাড়ার দেখাশুনো করি, নাহয় দু চারটে মাছের টুকরো তার বদলে খাজনা ভেবেই নিই, তাবোলে ছিঁচকে বিলে আর আমি এক হলাম!

এর থেকে তো মাছ খাওয়া ছেড়ে দেওয়াই ভালো.................. নাহ্ সেটা বোধহয় পারা যাবে না!



***

শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

গরম ভাতে কাসুন্দি




অফিস টাইমের ভিড়, বাসটা মানুষের চাপে একদিকে হেলে পরেছে । দাদা একটু চাপুন তো!এক মুশকো জোয়ান হাঁকল মহিলা সিটের সামনে একপায়ে ভরে দিয়ে ঝুলে থাকা এক মিহি গোঁফকে । কি ব্যপার এবার কোলে বসবেন নাকি?’ জবরদস্ত মাসিমা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন । দুদিকের হুড়োতে মিহি গোঁফ দিশেহারা, এরপর একেবারে ট্রাপিজের কায়দায় রড ধরে সিলিঙে ঝোলা যায় কিনা ভেবে দেখছেন । এই যে একটু সরে বসুন তো, বাচ্চাটাকে একটু বসতে দিন’; ‘কোথায় সরব আর জায়গা কোথায়?’ ‘কোনার সিটে অমন বেঁকে বসে আছেন আর জায়গা নেই! নিন সোজা হয়ে বসে বাচ্চাটাকে বসতে দিন। কথপোকথন চলছে বছর তিনেকের বাচ্চা কোলে এক অল্পবয়সী মা ও টিপটপ এক কলেজ পড়ুয়া আধুনিকার মধ্যে । আধুনিকা কথা না বাড়িয়ে সামান্য সোজা হয়, তাতে যে ইঞ্চি ছয়েক জায়গা হোল সেখানে বাচ্চা সমেত মা বসলেন বা বলা চলে বসার চেষ্টা চালালেন । ওরে বাবারে, হাঁটুটা একবারে থেঁতলে গেলো, ওইটুকু জায়গায় এতোবড় শরীর নিয়ে কেউ বসে!ফলতঃ এপাশের বউদির আর্তনাদ । এতবড় শরীর বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছেন, আপনার শরীরই বা কম কিসে?’ ‘দেখুন, শরীরের খোঁটা দেবেন না, আমি আপনার খাই না পরি?’ ‘শুরু তো আপনিই করলেন!’ ‘একে জোর করে বসলেন তারওপর ঝগড়া করছেন লজ্জা করে না?’ ‘লজ্জা কেন করবে আপনি আমার শাশুড়ি নাকি?’ ‘ভাগ্যিস নই যা মুখ!’ চোপ, একেবারে চোপ! সকাল সকাল কোথায় একটু শান্তিতে যাব, তা না কাক চিল বসতে দেবে না!অল্পবয়সি মা আর বউদির যুগলবন্দীতে মাসিমার তারানা ।

অ্যাই, কি হচ্ছে সোজা হয়ে দাঁড়ান না, বাড়িতে মা বোন নেই নাকি?’ না কোনও দিদিমণি নয়, ঝাঁকড়া চুল কাঁধে ঝোলা বছর বাইশের এক দাদামনি সুর করে ধমকালেন মুশকোকে । যাচ্চলে, আপনি মা না বোন?’ মুশকোর ঠোঁটে নচ্ছারি হাসি । ছোটলোক!দাদামনি তাঁর অভিধানের সবচেয়ে চোখা গালিটি ঝাড়লেন, মুশকোর হাসি চওড়া হোল ।

দরজার কাছে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন এক লম্বা বেনী দিদিমিনি, ‘একটু ভেতরে ঢুকতে দিন না’, দিদিমণির কাতর আহ্বান যেন রবি ঠাকুরের গান, মনে দোলা দেয় । আপাততঃ অবশ্য বাসটাই এমন দুলিয়ে দিলো যে লম্বাবেনী এক ছাপোষা দাদার একেবারে বুকে; আহা! যেন উত্তম সুচিত্রার এই পথ যদি না শেষ হয়’, অবশ্য ছাপোষা বউদি যদি দৃশ্যটা দেখতেন তাহলে পথের শেষ কোথায় গিয়ে হোত কে জানে! 

তখন থেকে বলছি সোজা হয়ে দাঁড়াতে, তবু হুঁশ নেই? আগে সোজা হয়ে দাঁড়ানো শিখে তবে বাসে উঠবেন, যতোঃসব !’  বাসের দুলুনিতে মিহি গোঁফও মাসিমার পদানত; এক্ষেত্রে অবশ্য প্রতিক্রিয়াটা প্রায় মহিষাসুর দলনী দুর্গার মত। দাদা টিকিট!ঠিক এইসময়ই কন্ডাক্টারের হাঁক মিহিগোঁফকে, ‘ব্যাপারটা কি বাস চালাতে পারেননা ঠিক করে আর টিকিট চাইতে এসেছেন?’ মাসিমার অপমানের ঝালটা পরল কন্ডাক্টারের ওপর । বাস ঠিকই চলছে, আপনার অসুবিধে হয় নেমে ট্যাক্সি করে যানসেও সমান তেরিয়া । কি বাস ঠিক করে চলছে? তখন থেকে ঢিকির ঢিকির যেন গরুর গাড়ী আবার ট্যাক্সি দেখানো?’ এবার সরব হলেন এক গম্ভীর চেহারার মেশোমশায়, আর তাঁর সাথে তাল জুড়ল প্রায় গোটা বাস । যা বলেছেন এই করেই কলকাতাটা একেবারে উচ্ছন্নে গেল । কথায় কথায় ভাড়া বাড়াবে অথচ কাজের বেলায় ফক্কা। বেগতিক দেখে কন্ডাক্টার সরে পরে, আলোচনা মোড় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক । ‘এই যে কদিন পরপর ভার বাড়ানোর স্ট্রাইক এর পেছনে বিরোধীদের চক্রান্ত নেই ভেবেছেন?’ ‘আরে মশাই এ সবই সরকারের কারসাজি, ভোটের আগে ব্যাটাদের হাতে রাখতে চায়’। ‘মোটেই না কেন্দ্রীয় সরকার সব ব্যাপারে হাত উলটে বসে আছে তো রাজ্য সরকারের কি দোষ?’ ‘দেখুন মশাই সব কথায় কেন্দ্রকে টেনে আনবেন না, যতো বাহানাবাজ!’ ‘দেখুন মুখ সামলে, কেন্দ্রের নামে বললে আপনার গায়েই বা লাগছে কেন?’ ‘আপনি মুখ সামলে!’

ডালহৌসি, ডালহৌসি!কন্ডাক্টারের চিল চিৎকার যেন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা; মৌচাকে ঢিল পরার মতই লেগে যায় হুড়োহুড়ি, লক্ষ্য একটাই, তাড়াতাড়ি বাস থেকে নামা । 

***

শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৪

অভিমানিনী



ভোরের আলোয় তার বার্তা পেলাম, যেন ঘুম ভাঙানিয়া গান;
হিমেল দিনের রোদের মতই মায়াময় ।
শব্দের বোনা জালে না দেখা বন্ধুর হৃদয়ের উষ্ণতা;
আমি যে কতো দামী তারই অনাবিল আশ্বাস ।
তবু যে কথা ছিল না লেখা, মনকে নাড়িয়ে গেলো তাই,
নরম জোছনার মত নীরবে চুঁইয়ে পরা অভিমান;
সে আমাকে মনে রাখে শতকাজে প্রতিদিন,
আমি আছি তার নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে ।
আমার না দেখা বন্ধু সুদূর প্রবাসী, আমি ভুলে আছি তাকে বহুদিন । 
ভালবাসা, প্রেম, বন্ধুতা, এসবই আমার আছে জানি,
তবু এমন নীরব অভিমান, এযে অনেক দামী; অভিমানিনী ।।