শুক্রবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৭

ছাড়া কি যায়?

আমার ঢাকার বাড়ির বারান্দায় আলো আঁধারির ছায়া ফেলে ঝুঁকে আছে যে গাছটি,
বহুকালের চেনা বন্ধুর মতই তার উপস্থিতি , আমার এই তিনবছর ব্যাপী প্রবাস জীবনে;
নাম জানতে চাইনি কখনও, নামে কি বা আসে যায়?
গ্রীষ্মের দখিনা বাতাসে তার পাতায় ঢেউ, আমাকে ছুঁয়ে যায় আলতো আলিঙ্গনে,
বাদলা দিনের একলা দুপুরে সিক্ত পরশে সে জানায়, ‘পাশেই আছি’,
মন উঁচাটন বসন্তদিনে ডালপালা দুলিয়ে হাতছানি দেয় পরম আদরে।
আজ যাবার দিনে, তার চিকণ পাতার নরম সবুজে রয়ে যাবে আমারও একটু খানি,
ছাড়তে চাইলেই ছাড়া কি যায়?

গাছের ডালে, বারান্দার কার্নিশে নিত্য তার আনাগোনা, গলায় সাদা দাগ,
গল্পপ্রিয়, প্রতিক্রিয়াশীল এক বাঙ্গালিনী কাক;
আমার মত সেও একটি মেয়ের মা, মাতৃত্বের অনেক কিছু শিখেছি তার কাছে।
ছটফটে, চটপটে একজোড়া বুলবুলি, দূপুরের লেখালেখির মগ্নতার মাঝে,
পড়ার ঘরের কাঁচে, ঠোকর দিয়ে জানান দেয় গোপন অভিমানে,
আমারও আছি সাথে।
লক্ষ্মীমন্ত বেনেবউ কাঁচা হলুদ গা, হালকা পায়ে উড়ে বেড়ায় এডালে, ওডালে,
হোল না তো কমদিন, তবু আমার মুগ্ধতা আজও সেই প্রথম দিনের মতই।
চলে যেতে হবে সবাইকে ছেড়ে, তবু নিঃসঙ্গ দিনে আলো ছায়ার আঁকিবুঁকিতে, রয়ে যাব আমি;
ছাড়তে চাইলেই ছাড়া কি যায়?

চায়ের কাপ হাতে জানলায় বসলেই, দেখা যায় শ্যামলিমা ঘেরা বারিধারা ঝিল,
তার গহন গভীর জলে ডুব দিয়ে, কুড়িয়ে আনতে সাধ হয় জমে থাকা বহূযুগের কথা;
উজ্বল দিনে সোনা চিকচিকে ঢেউয়ে, পাল তোলে আমার সুদূর পিয়াসী মন।
ধ্যানগম্ভীর পূবের দিগন্তের গেরুয়া, ছুঁয়ে যায় আমার অন্তঃস্থল প্রতিদিন;
গোধূলির কোনে দেখা আলোয় দূরন্ত পশ্চিমী ক্যানভাস –
ধরে রাখি মনের লেন্সে ক্লান্তিহীন মুগ্ধতায়।  
আমি চলে যাব; তবু ঝিলের ঢেউ ছন্দহীন হবে না, সূর্যাস্তের রঙে আঁকা হবে নতুন কাহিনী;
শুধু আমার নিঃশ্বাস বাস্প, ভোরের শিশির হয়ে মূর্ত হবে জানলার কাঁচে;
ছাড়তে চাইলেই ছাড়া কি যায়?


***
©1917 ananyapal ALL RIGHTS RESERVED

শুক্রবার, ১১ আগস্ট, ২০১৭

জঙ্গল সাফারি ও গদাযুদ্ধ

কদিন আগে পতিদেব ও আমি জনা চারেক বন্ধু সমেত গেছিলাম কেনিয়ার জঙ্গলে; আমার জঙ্গলযাত্রা এই প্রথম, তাও একেবারে রোমহর্ষক মাসাইমারা, এযেন একলাফে গাছে ওঠা চারজনের মধ্যে দুজন বন্ধু ফোটোগ্রাফার; পতিদেবও ইদানিং ওইদলে নাম লিখিয়েছেন, অতএব সাফারি সফরের রোমাঞ্চ যে কি, সে বিষয়ে সম্বৃদ্ধ হতে হতে পৌঁছে গেলাম নাইরোবি এয়ারপোর্টে হাজির গাইড কাম ড্রাইভার কাকা (না আমার খুড়ো নয়), সাফারি জীপ সাথে নিয়ে; শুনলাম এই বাহনই সামনের সাতদিন হবে আমাদের পীঠস্থানও হরি, মাথাখোলা হাড়গিলে এই জীপে সারাদিন চেপে থাকলে পীঠের স্থানে কি অবশিষ্ট থাকবে ভেবে আমি ততক্ষণে হতভম্ব

যাইহোক, ভোর না হতেই প্রতিদিন বালিশ কাঁধে ফোটোগ্রাফারের দল (ওঁদের দাবি ওগুলো বিন ব্যাগ) জীপের পশ্চাদপট দখল করেন; বাকি দুই আনাড়ী সাথী নিরাপদ দূরত্বে সামনের দিকের সিটে, মুশকিল হোল আমাকে নিয়ে অবস্থার গতিকে আমাকে বসতে হয় ফোটোগ্রাফার দলের আওতার মধ্যে, পুরস্কার স্বরূপ কোনও জন্তু বা পাখী দেখলেই স্টপ স্টপবলে তারস্বরে চ্যাঁচানোর দায়িত্ব বর্তাল আমার ওপর চ্যাঁচ্যাঁতে আমি চিরকালই ওস্তাদ, কিন্তু গোল বাধল অন্য জায়গায় ফোটোগ্রাফারের দল গদাধারী ভীমের মত গদা, থুরী ক্যামেরা উঁচিয়ে সারাক্ষণ আস্ফালন করেন, একটা কিছু দেখা গেলো কি গেলোনা, তাঁদের রণহুঙ্কারে আমি তস্থ! একদিন ঝোপের ধারে দেখা মিলল সিংহমামার, একটা নয় গোটা তিনেক (জঙ্গল তো নয় মামারবাড়ী!); ফোটোগ্রাফার বাহিনী যথারীতি উত্তেজিত, নিজের মোবাইলে জানলা দিয়ে একটা ছবি তোলার চেষ্টা করতেই পতিদেবের গদারূপী ক্যামেরার বাড়িতে আমার ডান হাত অবশ এত নড়াচড়া করলে এই হয়স্বান্তনা বাক্য নয়, খ্যাঁকানি কানে এলো কিছুদূরে একটা সিংহছানা দেখে উত্তেজিত হয়ে দাঁড়াতে গেছি, ‘এ তো আচ্ছা বেকুব! লায়ন কাবের বদলে তোমার টুপীর ছবি নিয়ে বাড়ী যাব না কি?’ এক বন্ধু হুড়ো দিতে কাঁচুমাচু মুখে বসে পড়ি রাস্তার দুধারে দিগন্ত বিস্তৃত সাভানা ঘাসের ঢেউ, মাঝে মাঝে আকাসিয়া গাছ নয়নাভিরাম; এরই মধ্যে একটা গাছের মাথায় ঈগল দেখে যথারীতি স্টপবলে চেঁচিয়েছি গাড়ী থেমেছে কি থামেনি, বান্ধবীর ক্যামেরা তেড়ে এলো আমার মুখের ওপর ওরে মারা পড়ব যে!’, ‘সাফারিতে এসব একটু সহ্য করতে হয়’, আমার আর্তনাদের উত্তর মিলল একেই লগনচাঁদা মুখশ্রী, তায় গদাপ্রহারে তুবড়ে গেলে যে বেবুনরাও দলে নেবেনা, বোঝাই কাকে! এদিকে আর এক গেরো সামনে বসা দাদাকে নিয়ে, ভারি গোবেচারা দাদাটি ভালো কিছু দেখা গেছে কানে গেলেই উদ্ভ্রান্তের মত তাঁর দু-ফুটিয়া আইপ্যাডটি মেলে ধরেন; এভাবে তিনি ছবি কতদূর তুলতে পেলেন জানিনা, তবে গাড়ীর সামনের কাঁচ দিয়ে খালি চোখে কিছু দেখার আশাও আমায় ছাড়তে হোল একবার চিতা দেখা গেলো গাড়ীর সামনে, সবাই খুব উত্তেজিত; আমি অবশ্য আইপ্যাডের কালো ঢাকনার ওপর দুটো হলুদ কান দেখেই সন্তুষ্ট রইলাম সুখের কথা এই যে, দাদা আমার, সাফারিতে বেশীরভাগ সময় ঢুলেই কাটিয়েছিলেন

দুর্গম জঙ্গুলে রাস্তায় জীপের দোদুল দোলা, সাথে দুর্ধর্ষ ফোটোগ্রাফারদের জঙ্গী হামলা, এসব সয়ে জীবনের প্রথম সাফারি সফরের যে অভিজ্ঞতা আমার হোল, চাঁদের পাহাড়ে শঙ্করের অভিযানের থেকে তা কম কি সে! শুধু আমার অ-ফোটোগ্রাফার বন্ধুদের জন্যে একটা উপদেশ, ‘কুঁজোর চিৎ হয়ে শোয়ার চেষ্টা না করাই ভালো’; তারপরও নেহাৎ জঙ্গলে যেতে হলে সাথে বর্ম ও হেলমেট নিতে ভুলবেন না; আর হ্যাঁ বালিশও একটা নেবেন, না ছবি তুলতে নয়, পিঠে গুঁজতে কাজে দেবে  

***
©2017 ananyapal ALL RIGHTS RESERVED

মঙ্গলবার, ১৩ জুন, ২০১৭

আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে

খোলা বাতায়ন পথে দখিণা বাতাস বয়ে আনে স্নিগ্ধ পরশ তন্দ্রাতুর অলস মধ্যাহ্নে,
নুয়েপড়া বৃক্ষশাখে রাঙা কিংশুক গুচ্ছ দোলে, সলজ্জ হরষে;
বুঝিবা বলতে চায় কিছু।
উদ্যান মাঝে যত্নে বাঁধানো পুষ্করিণী, শ্বেতপদ্ম ফুটে আছে তার নীল জলে,
বকুল বৃক্ষের ছায়াঘন প্রস্তর বেদিকা, ঝরা বকুলের সমারোহ সেথা,
যুথি,জাতি, মল্লিকা কুন্দফুলে উপবন, নন্দনকানন;
বাতাস মদির পুষ্প সৌরভে।

একাকী পুরুষ রয়েছেন বসে গবাক্ষ পাশে, অতিশয় কান্তিমান,
তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ, দীর্ঘ, ঋজু দেহ, দেবতুল্য মুখশ্রী,
চোখদুটি কোমল, ভাবময়, না জানি বিভোর কোন মধুর কল্প লোকে,
উন্মুক্ত কাঁধে দৃশ্যমান উপবীত, কুঞ্চিত কেশদামে বাতাসের মৃদুস্পর্শ;
সম্মুখে রয়েছে সুসজ্জিত কাঠের পীঠিকা, সম্বৃদ্ধ লেখার সরঞ্জামে,
যুথীমাল্য ঘিরে আছে মসীধার, সুগন্ধী ধূপ জ্বলে কুলুঙ্গীতে,
তালপত্রে লিখে চলেছেন কিছু নিবিষ্ট আগ্রহে, বিদগ্ধ পুরুষ।

ক্ষণপরে থেমে যায় লেখনী,মুখ তুলে চান যুবা অন্যমনে,
দুচোখের ভাষায় অজ্ঞাত তৃষ্ণা, নীরব অভিব্যক্তি বেদনাবিধূর,
মধুময় দ্বিপ্রহরে, বসে থাকেন কবি, নিঃসঙ্গ মূরতি।
রামগিরি পর্বতে রাম-সীতার মিলন আশ্রমে, অভিশপ্ত যক্ষ,
কাটাবে দীর্ঘ বিরহকাল,
প্রণয় মাধুর্যের স্মৃতি নিষ্ঠুর দংশনে দংশাবে তিলে তিলে;
তাই কি মলিন কবির সুকুমার মুখ?
বিরহ কি শুধুই যক্ষের!
কৈলাস পর্বতে ফেলে আসা প্রেয়সী, সে কি শুধুই কল্পনা!

সিক্ত বাতাসের দমকে, শিহরণ জাগে, চোখ যায় বহির্পানে,
মধ্যাহ্নের প্রখর সূর্য উত্তাপহীন, যেন কোন জাদুমন্ত্রবলে;
উম্নুখ কেকারবে মুখর কানন।
মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে দেখেন কবি, কৃষ্ণমেঘ সবল প্রতাপে ঢেকেছে দিগন্ত,
প্রবল গর্জনে তার অগ্রীম বর্ষণ বার্তা;
দেশ দেশান্তরে বর্ষার ক্লান্তিহীন দূত, বয়ে নিয়ে যাবে আনন্দ সন্দেশ এমনই গৌরবে।
মৃদু হাসি ধরা দেয় ওষ্ঠাধরে, লেখনী সরব হয় তালপত্রে পুনর্বার,
“আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং
বপ্রক্রীড়াপরিণতগজপ্রেক্ষণীয়ং দদর্শ।।“
কবিশ্রেষ্ঠ নিমগ্ন হন কাব্যে তাঁর।

***
©2017 ananyapal ALL RIGHTS RESERVED

মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

প্রণয়সাক্ষী


ভোরের নরম আলোয় অগস্ত্য তীর্থের নীল জল কাকচক্ষু,
গুহা অলিন্দে যক্ষ ও বক্ষলগ্না প্রেয়সী নবপ্রেমরসে বিভোর,
তোমার স্থাপত্য শিল্পে পেয়েছে প্রাণ রুক্ষ প্রস্তরখন্ড,
তোমার কল্পনায় আজ স্বর্গীয় যক্ষ প্রেমগাথা।

আমি দেবদাসী নিত্য আসা যাওয়া এই বিষ্ণু মন্দিরে,
অলক্ষে চেয়ে থেকেছি কতদিন, আত্মমগ্ন তুমি দেখনি ফিরে;
সেদিন বসন্ত পঞ্চমী তিথি, এমনি ভোরের আলোয় ঘুমিয়ে ছিলে গুহা মন্ডপে,
জাতি পুষ্পহার এসেছিলাম রেখে অতি চুপে  চরণে তোমার,
'দেবী উপাচারের মালাটি তোমার ভূমিতে লুটায়' -
পিছু ডেকে বলেছিলে।

'হায় শিল্পী, পাথরের বুকে নিত্য জাগাও যে প্রেম, সে কি শুধুই কল্পনা!
রূদ্ধ রেখেছ হৃদয়ের দ্বার, বসন্ত সমীর সেথা মাথা খুঁড়ে মরে' -
মৃদু তিরস্কারে বলে উঠি অভিমানে ।
'ভাল করে দেখেছ কি চেয়ে, যক্ষীণির মুখখানি অনঙ্গসেনা?
ও দুটি কালো আঁখি লাগে না কি চেনা, ওই ওষ্ঠাধর পদ্ম কোরকসম সেও কি অচেনা!'
মৃদু হাসি জেগে ওঠে তোমার ঠোঁটের কোণে,
আমি আত্মবিস্মৃত হই নতুন আবেগে,  জলে ভাসে আঁখি।

বহুযুগ পরে নব পরিচয়ে এসেছি আবার সেই পুরানো আলয়ে, 
প্রস্তরে প্রস্তরে সেথা বাজে প্রণয়ের সুর,
যক্ষী- যক্ষীণী আজো সাক্ষী হয়ে আছে আমাদের চিরমিলনের।।
***
©1917 ananyapal ALL RIGHTS RESERVED

বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৬

ঝুলন দোলা

সকাল সকাল ঘন হয়ে এসেছে আকাশ, বারান্দার পাশের কৃষ্ণচূড়া আদুরে বাতাসে টলমল;
ব্যস্ত পায়ে বন্ধ করছি দরজার কাঁচ – কি যে হোল,
চোখ ফেরতে পারলাম না, কাজ ফেলে বেরিয়ে এলাম।
এলোঝেলো বৃষ্টির ছিটের মায়াবী স্পর্শ মেখে,আমি বসে থাকি বিমূঢ় মুগ্ধতায়;
কোন সে মোহনিয়া সুরে বশীভূত মন আমার।
ভরা শ্রাবণ, বৃষ্টি যে নিত্যসঙ্গী, এমন কাজ ভোলানো উচাটন হয়নি তো আগে!
মনে পড়ে গেলো, আজ ঝুলন।

আবছায়া স্বপ্নের মত মনে পড়ে সেই বর্ষণ স্নাত আর্দ্র অপরাহ্ন,
গোধূলী বেলার আবির বুঝিবা কিছুটা ধুসর,ছায়াঘন মাধবী বিতান;
আনমনা মেয়েটি একা বসে, গাছে বাঁধা দোলনায়, সাথী নেই কেউ আর।
আলোগোছা বেণীতে জুঁই ফুল,কপালে সোহাগী সিঁদুর,ঘননীল শাড়ীতে যমুণার ঢেউ;
কাজল কালো তার দুটি চোখ, বড় মায়াময়।
বিয়ের পর এই প্রথম শ্রাবণে এসেছে বাড়ী, না বাড়ী তো নয় আর, বাপের বাড়ী,
আনন্দ উচ্ছ্বাসে, আদরে, খাতিরে নিটোল ছিল সারাটা দিন –
তবু কেন এই উদাসী ক্লান্তি, ফাঁক পেয়ে ছুটে আসা বাগানের প্রিয় কোণটিতে!

দূর থেকে ভেসে আসে বাঁশরীতে মারবা-র তান, সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলো ওই,
রূপোলী জোছনা মেখে ফুলবন স্বপ্ন বাসর;
হালকা বাতাস খেলা করে কপালের ঝুরো চুলে,জমে ওঠা মুক্তাবিন্দু  ছলকায় চোখে।
দীর্ঘ ছায়া ফেলে, শান্ত পায়ে কে এসে দাঁড়ালো ওই দোলনার পাশে!
ভারি সুকুমার হাসিমাখা মুখখানি, আনন্দ মূরতী;
মৃদু দোলা দেয় সে ঝুলনায়, চমকে ফিরে চায় মেয়ে, চেয়েই থাকে বুঝিবা অনন্তকাল,
সব অভিমাণ ভেসে যায় শ্রাবণ বরিষণে; -
ঝুলন দোলায় দোলে ফেলে আসা কৈশোর, চিরন্তন প্রেমে।


***
©1916 ananyapal ALL RIGHTS RESERVED

বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০১৬

কুড়োনো মাণিক

মহল্লার সবচেয়ে বড় দোকানটা সাবির মিঞার, শাড়ীর সম্ভার সেখানে চোখ ধাঁধানো;
ছেলেটার সাথে আমার সেখানেই দেখা, ফুফার পাশে পাশে শাড়ী দেখায় –
লক্ষ্য করেছি দাম নিয়ে মতবিরোধে, আমার হয়ে সুপারিশ করে হামেশাই;
‘ছেলেমানুষ, ঝানু দোকানদার তো নয়’ স্নেহ অনুভব করি মনে মনে।
সেবার বন্ধু এসেছেন কোলকাতা থেকে, জামদানী পাড়ায় যেতেই হয় অতএব,
এমন কপাল, সাবির মিঞা গেছেন মহাজনের কাছে, দোকান বন্ধ;
ভাবছি দাঁড়িয়ে কি করি, বান্ধবীও আশাহত,
‘আপা আসেন ইদিকে’ পাশের খুপরি দোকানটা থেকে উঁকি দিলো ছেলেটার হাসি মুখ।
 একটু ইতস্তত করে এগোই,’এটা কার দোকান?’
‘আল্লাহ্‌র দোয়ায় আমারই’ ছেলেটার সলজ্জ উত্তর, সেইসঙ্গে এগিয়ে দেওয়া ছাপা কার্ডটা থেকে প্রথম জানলাম ওর নাম দিলাবার।

‘শাড়ী দেখাতে পারবেন কিছু পছন্দসই?’ আমি তখনও ধ্বন্দে;
রঙ আর ডিজাইনে আমার পছন্দ যে একটু ব্যতিক্রমী; –
বান্ধবীও শিল্পীমনা, সাদামাটায় মন উঠবে না জানি।
‘শুধু পাঁচটা শাড়ী দেখাবো আপনাকে’, ‘মোটে পাঁচটা? আর নেই বুঝি?’ –
আমি আঁতকে উঠি;
‘আছে আলমারি ভরা, কিন্তু সেসব আপনার জন্যে নয়, দেখুনই না আগে’,
মুচকি হেসে বুঝিবা চ্যালেঞ্জ জানায় দিলাবার।
পাঁচখানাই দেখিয়েছিল সেদিন; আমরা পলক ফেরাতে পারিনি।
ভয়ে ভয়ে দাম জানতে চেয়ে হোঁচট খেলাম –
এতো অবিশ্বাস্য রকমের কম! গোলমাল আছে কিছু শাড়ীতে?
বিভ্রান্তি নিয়ে ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে মিলল সব প্রশ্নের উত্তর;
‘আপনি আমার বইন, আপনার জন্যে আলাদা দাম’, কথাটা বিশ্বাস করেছিলাম সেদিন।
 এরপর থেকে দিলাবারের কাছেই যাই শাড়ীর খোঁজে,
পাঠাই বন্ধুদেরও –
দাম নিয়ে অভিযোগ করেনি কেউই, শাড়ীর মান নিয়েও নয়।

গরমের  ছুটিতে বেড়ানোর লম্বা পরিকল্পনায় অনেকদিন বাড়িছাড়া,
ইতিমধ্যে এলো সেই দুর্যোগময় রাত,শোকে স্তব্ধ ঢাকা –
আটকে পড়লাম কোলকাতায় আরও বেশ কিছুদিন।
প্রায় দুমাস পর ক্লান্ত শরীর, বিষণ্ণ মন নিয়ে ফিরলাম বাড়ী,
একটু গুছিয়ে নিয়ে মনে পড়ল, দিলাবারকে একটা শাড়ীর অর্ডার দেওয়া ছিল,
ফিরেছি জানান দেওয়া চাই, বেচারার টাকা আটকে থাকে নচেৎ।
‘আপা আপনারে ফোনে পাই না, আমার মনটা যে কেমন করে!’ ছেলেটার আকুলতা দুলিয়ে দেয় আমায়;
‘কোলকাতায় ছিলাম, তাই এখানের নম্বরটা বন্ধ ছিল’ আমি বোঝাই।
‘আপনার বাসার এত কাছে ঘটল ঘটনাটা, ফোনে পাই না –
আমি দুইরাত ঘুমাই নাই, মানত করছিলাম মসজিদে;
দুই দিন পর কাগজে নিহতদের নাম পাইয়া, তবে শান্তি; আমার বুইনের কিছু হয় নাই; -
ততক্ষণে আমি ভাষাহারা, লবণাক্ত জলে ভিজে ঠোঁট।
কখন অজান্তে আমার অস্তিত্বকে ভয়ানক দামী করে দিলো ছেলেটা,
আঁকাবাঁকা পথের বাঁকে কুড়িয়ে পেলাম এক অমৃত মাণিক;
জীবনে আর কিছু চাওয়ার বাকী থাকে কি এরপরও?  

***
©1916 ananyapal ALL RIGHTS RESERVED


মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই, ২০১৬

কিনারা

জলের উথাল পাথাল ঢেউ, দাঁড়ের ছুপ ছুপ টানে,
ভেসে চলে নৌকোখানি কিনারার পানে;
পূবের হাওয়ায় দোল দিয়ে যায় আমার ধুসর চুলে,
আনমনে গান গেয়ে উঠি কখন মনের ভুলে;
সোনা রোদের নরম ওমে আমার গালে রঙ,
চোখ বুজে তার নরম আদর মাখি বহুক্ষণ
শ্যামলা ঘাটের কোল ছাড়িয়ে দিয়েছি পার সে কোন যুগে,
পেছন ফিরে চাইতে গেলে, চোখে তারই স্বপন জাগে,
মায়ায় বাঁধে মন

কাজলা নদীর কালো জলে, নিরুদ্দেশের অচিন নেশা,
নবীন বেলায় করেছিল আমায় যাযাবর,
সপ্ত সিন্ধু পার হব, বুক বেঁধে এই আশায়,
হলাম আমি নাবিক সওদাগর
ঘাটে ঘাটে পসরা ভরে হোল অনেক বেচাকেনা,
জমা খরচ হিসেব কষে, মিটিয়ে দিয়ে সকল দেনা,
নতুন করে ভেসেছি আজ অনেকদিনের পর

রাতের তারার শামিয়ানা, ভোরের অরুনিমা,
পাখীর ঠোঁটে বয়ে আনা টুকরো শ্যামলিমা;
ছড়িয়ে আছে চলার পথে এমন যত মণি,
দুচোখ ভরে কুড়িয়ে তাদের, আজকে আমি ধনী।
ভেসে আসা টুকরো গ্লানি, ঝড়ের রাতের আঁধার,
তাদেরও রেখেছি তুলে ভান্ডারে আমার
অপরাহ্নের শান্ত আলোয় স্পষ্ট পরপার,
সন্ধ্যা হলে সেইখানেতে বাঁধব নোঙর।
মাটির বুকে পাতব শয্যা শেষের সেই দিনে,
ঘাসের চাদর রাখবে ঢেকে পরম যতনে;
ঘাসের ফাঁকে রইবে ফুটে জমানো ধন যত,
কাঁটাও কিছু হবে শোভা ফুলের মালার মত।

©ananyapal2016