বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৪

মিলন রাতি

ঝরোখার কিনারে বসে আনমনা রূপসী ,
ঈষৎ বেঁকানো গ্রীবায় এলো খোঁপা খানি,
গোধূলির লালিমায় রেঙেছে চিবুক -
সিঁথির কুঙ্কুম যেন পদ্মরাগ মণি
চকিত চঞ্চল তার কালো দুটি আঁখি,
মধুর আবেশে মগ্ন কোন সে স্বপনে -
থেকে থেকে ফিরে চায় কোন সে আশায়?
রাজঅন্তঃপুরবাসিনী কিশোরী কমলা,
রাওয়াল কুমার তিলস্কির নবপরিণীতা ।

সেদিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা,
বেজেছিল মঙ্গল শঙ্খ, নহবতে বেহাগের সুর, 
নিভৃত বাসরে বেলা চামেলির সুরভি মধুর ।
‘এ কোন চাঁদ চাঁদনীকে মানায়  হার?’
অস্ফুটে শুধান কুমার
ওড়নির আড়ালে লজ্জায় থিরথির
কিশোরী কমলা, নবপরিণীতা রাজবধু  ।

নিভৃত বাসরে গর্জে ওঠে রনভেরি -
ফিরোজ শাহের সেনারা ঘিরেছে মরুদুর্গের দেউড়ি,
‘বিদায় দাও প্রিয়ে, যেতে হবে আজি ডেকেছে মাতৃভূমি’ ।
বরবেশ ছেড়ে বীরবেশে সাজে তিলস্কি রাওয়াল;
স্বামীকে রণটিকা পরায় কমলা,
ঠোঁটে আধো হাসি চোখে ভরা দীঘি টলমল ।
গভীর আবেশে হাতে হাত রেখে বলেন কুমার,
‘বাসর শয্যা থাকুক পাতা, ফিরব রানি,
তোমায় আমায় পূর্ণ হবে মিলন রাতি’ ।

ঝরোখার পাশে আঁখি মেলে বসে কিশোরী বধূ
বাসর শয্যা তেমনই পাতা, ফুল শুকিয়েছে শুধু ।
হাল্কা পায়ের আওয়াজে কমলা চমকে চায়
এই বুঝি দাসী আনল খবর, আসছেন স্বামী তার ।
দাসী নয় রানী রাজসি দেই -
‘সাজ বধূ আজ রাঙা চেলী আর ফুলসাজে
বাসর তোমার সফল হবে আজ রাতে’ ।
নতুন বসন, ফুল আভরন গলায় যূথীর মালা
শ্বেত চন্দন রাঙা কুঙ্কুমে অপরূপা কমলা ।
আকাশের চাঁদ আজও আছে সাথে, আছে সেই মধুরাত
ফুলডোর নয় অঙ্গার আজ সাজাল বাসর তার ।
যবন নিধনে রাজপুত বীর সাকা বেঁধেছে মাথে,
পুরনারী সব জহর আগুনে মরণ খেলায় মাতে ।
কুমারের পাগ বুকে নিয়ে বধূ আগুনকে করে সাথী
অবশেষে তার পূর্ণ হোল মহা মিলন রাতি ।।

পরিশিষ্টঃ দিল্লীশ্বর ফিরোজ শাহ্‌ তুঘলকের আক্রমন রুখতে জয়সলমির দুর্গে সাকা অর্থাৎ মাথায় গেরুয়া কাপড় বেঁধে মৃত্যুপণ করে যুদ্ধ করেছিলেন ১৭০০ রাজপুত আর জহরের আগুনে প্রাণ দিয়েছিলেন ১৬০০০ পুরনারী । যুদ্ধে রাওয়াল ডুডোজি ও কুমার তুলস্কির মৃত্যু হয় । এই কবিতার প্রেক্ষাপট এই ঐতিহাসিক ঘটনার ভিত্তিতেই । কবিতার কুমার তিলস্কি ও রানি রাজসি (রাওয়াল ডুডোজির মহিষী) ঐতিহাসিক চরিত্র, কমলা আমার কল্পনা প্রসূতা ।


বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০১৪

মানে না মানা

‘রাগ করেছো?’ মোবাইলে মেসেজটা দেখে ভাবতে বসলাম কাকে কাকে দুএকদিনের মধ্যে দাঁত খিঁচিয়েছি । ‘জবাব দিচ্ছনা যে, এতো রাগ!’ ‘আচ্ছা আমি নাহয় মাফ চাইছি হোল তো?’ এযে মেঘ না চাইতেই জল! শেষ কবে কেউ এমন মিষ্টি করে আমার রাগ ভাঙিয়েছে মনেই পরে না (বাড়িতে বাকিদের মানভঞ্জনের মনপলি আমারই কিনা) । ভাবছি জবাবে কি লিখি, এরমধ্যেই আরেকটা মেসেজ, ‘নীপা প্লিজ কিছু বল’ । যাক এতক্ষণে সব ফরসা হোল, মেসেজ গুলো নীপা নাম্নী এক সৌভাগ্যবতীর; মানে যার রাগ অন্ততঃ একজনের কাছেও ভারি দামী । বেচারি প্রেমিকের জন্যে প্রাণটা কেমন হুহু করে উঠল, জবাবে লিখলাম, ‘আমি তো নীপা নই, আপনার বোধহয় কিছু ভুল হয়েছে’ ।  ‘ভুল তো হোয়েছেই, আর সেতো আমি স্মীকার করছি, তাবোলে আমাকে এড়াতে বলে দিলে তুমি নীপা নও!’ ‘না না বিশ্বাস করুন আমি সত্যি নীপা নই, নীপা নামের কাউকে চিনিও না’ । ‘নীপা তুমি যদি বারবার এরকম বল আমি কিন্তু ঠিক একটা কিছু করে বসবো!’ আমি আতঁকে উঠি, শেষে কি আত্মহত্যার প্ররোচনায় জেলে যাবো! মেসেজের অভিমানী হুমকি সমানে চলছে; অনেক ভেবে মেসেজ করলাম, ‘বেশ তবে আমাদের বাড়িতে এসে যা বলার বল, আমি শুনবো’ । ভাবলাম, মোবাইল নম্বর ভুল হয়েছে বলে বাড়ির নম্বর তো আর ভুল হবে না, ফলে সমস্যা মিটবে । ‘নীপা সত্যি বাড়িতে ডাকছ? কোন গোলমাল হবে না তো?’ ‘না না গোলমাল কিসের, তুমি বাড়ির সামনে এসে একটু দাঁড়াও, ঠিক একটা ব্যবস্থা হবে’ আমি স্বান্তনা দিই । ‘বেশ তবে আসছি, ঠিক দশ মিনিটে বারান্দায় এসো আমায় দেখতে পাবে’ ।

খানিক পরে আবার মেসেজের গুঁতো, ‘কি হোল, বারান্দায় এসো, দেখ তোমার পছন্দের লাল টিশার্টটা পরেছি’ । এবার আর জবাব দিলাম না ।  সবে বিকেলের চা টা নিয়ে বসেছি, বাইরে থেকে ক্রিকেট বল এসে পরল বসার ঘরে; আজকাল এই এক জ্বালাতন পাড়ার হবু শচিন দের নিয়ে । রাগ করে বলটা বাইরে ফেলতে বারান্দায় গিয়ে আমি থ; লাল টিশার্ট পরা এক রোমিও জুলুজুলু চোখে চেয়ে আছে আমাদের বিল্ডিঙের দিকে । তেল সাবান না জোটা লম্বা চুল, গালে খোঁচা দাড়ি বছর পঁচিশের এক ছোকরা; আগে কোনদিন দেখেছি বলে মনে পরে না । কি বিপদ, শেষে মেসেজগুলো কি আমাকেই করেছিল নাকি? আমার সন্দীপা নামটাকেই ছোটো করে নীপা; মাথা একেবারে ঝিম ঝিম, ভেতরে এসে সোফায় বসলাম কোনমতে । প্রেম অন্ধ একথা অনস্বীকার্য, তাবোলে দেড়া বয়সের এক খিটকেল মহিলা! ছোকরার পছন্দের মাথামুণ্ডু পেলামনা, এদিকে চা জুড়িয়ে ঠাণ্ডা । এরমধ্যে বেলটা বেজে উঠল, কি জানি ছোঁড়ার এতো সাহস শেষে ফ্ল্যাটে হানা! ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দেখি বীথি, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম । বীথি আমাদের নীচের ফ্ল্যাটে থাকে, মাস কমুনিকেসনে মাস্টার্স করছে, ভারি মিষ্টি মেয়ে; বউদি বলে ডাকে, মাঝে মাঝে গল্প করতে আসে আমার সাথে । সকালে ও আমার একটা শাড়ী নিয়েছিল, কলেজের কোন অনুষ্ঠানে পরবে বলে, বুঝলাম ফেরত দিতে এসেছে, ‘এতো তাড়া কিছু ছিলনা বীথি’ আমি ভদ্রতা করি । ‘তাড়া ছিল বইকি বউদি, দাদার ফোনটা আসায় দৌড়ে এলাম ফেরত দিতে’ । মাথাটা গুলিয়ে গেলো, ওকে ভেতরে আসতে বলে বসে পরলাম । ‘দাদা ফোন করে শাড়ী ফেরত দিতে বলল’? ‘ধ্যাৎ, কিযে বল; শাড়ী নয় এটা ফেরত দিতে এসেছি’ ও নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিলো । ‘মানে?’ আমি হতচকিত । আরে সকালে গল্পের চোটে ভুলে তোমারটা নিয়ে গেছিলাম, এখন দাদার ফোনটা পেয়ে বুঝতে পারলাম’ । আমাদের দুজনের মোবাইলের মডেল এক, অতঃপর......... এতক্ষণে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল । ‘আমারও তোমাকে কিছু ফেরত দেবার আছে নীপবীথি’ । ‘কি?’ ‘সেটা বারান্দায় গিয়ে দেখ নীপা’ আমি হেসে বলি ।


***
Published in Prothom Alo on 21st March, 2016

বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

দাদাগিরি

এমনিতেই আমার মাথাগরম বলে বদনাম, তার ওপর রীতিমত চর্চা করা তাগড়া চেহারা; লোকে আমায় বিশেষ ঘাঁটায় না । পাড়ার ভালো মন্দের দায়, ছেলে ছোকরাদের ওপর নজরদারি, সে একরকম আমি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করি; তাতে মাঝে মধ্যে একে ওকে একটু কড়কাতে হলে কি বা এসে যায়! তবে আজ সকাল থেকেই বিলের কাণ্ড দেখে মেজাজ আমার সপ্তমে, এর একটা শেষ না দেখে আমি আর ছাড়ছি না । বেশ কিছুদিন ধরেই ঘোষ বাড়ীতে ওর চুপি চুপি যাতায়াত আমি লক্ষ করেছি, মিয়াঁ বিবি যখন কাজে যায় তখনই বেটা উঁকি ঝুঁকি মারে খিড়কির দরজা, নয় রান্নাঘরের জানলা দিয়ে । কার সায়ে এসব চলছে তাও বুঝি; গেলো মাসে ভালবেসে ও বাড়ির মিনিকে একটা ফিস ফ্রাই খাওয়াতে চেয়েছিলাম । তা দোকান থেকে বাগিয়ে আনতে একটু ঠাণ্ডা হয়ে গেছিল আরকি, অমনি মুখ ঝামটে বলল ‘বাসি খাবার আমি খাই না!’ আর এই ছিঁচকে বিলে, তার ওপর কি দরদ!

আজ তিতলিদির জন্মদিন, ঘোষ বাড়িতে হেভি খাওয়া দাওয়া, পাড়াশুদ্ধু লোকের নেমন্তন্ন; আমিও যাবো, তবে একেবারে শেষের দিকে, নেমন্তন্নের ধার আমি ধারি না । তাই তো বিলেটাকে সন্দেহ, আমি তো জানি ব্যাটা চুরি বিদ্যেয় এরই মধ্যে হাত পাকিয়েছে, নির্ঘাত লোকের ভিড়ে হাতসাফাইয়ের তালে আছে । আর চুরির দোসর যখন ঘরেই মজুত তখন আর পায় কে! কিন্তু আমি থাকতে সেটি হতে দিচ্ছিনা, তক্কে তক্কে আছি, আজ হাতে নাতে ধরে ওকে পাড়া ছাড়া করে তবে আমার শান্তি ।

বাড়ির ভেতর থেকে মাছের কালিয়া আর ভেটকির পাতুরির গন্ধে রাগটা প্রায় গলে যাবার জোগাড়, কিন্তু না, কর্তব্যে অবহেলা এ শর্মা করে না, তাই না পাড়ায় আমার এতো খাতির! যাইহোক, দিপুদের পাঁচিলের আড় থেকে আমি ঠিকই নজর রাখছি হতচ্ছাড়া বিলের ওপর । লোকজন বেশ কিছু আসতে শুরু করেছে, মিনি ঢঙ করে তিতলিদির সাথে সাথে ঘুরছে, যেন জন্মদিনটা আজ ওরই! খাওয়ার আসরে হাঁকডাক বাড়ছে, ঠাকুর সামাল দিতে নিজেই পরিবেশনে হাত লাগিয়েছে; এই মওকায় বিলে একলাফে বাড়ির ভেতর, আর যায় কোথায় আমিও মারলাম এক লাফ, একেবারে বিলের ঘাড়ে । দুজনে গড়াতে গড়াতে রান্নাঘরের দরজায়, গায়ের জোরে ব্যাটা নেহাত কম যায় না, সঙ্গে তেমনি গলার জোর, জাপটাজাপটি, গর্জন; আজ কেউ একপা পিছব না, যা থাকে কপালে । ‘আ মল যা, এদুটো আবার ঠিক জুটেছে! মাছের গন্ধ পেয়েছে কি হতচ্ছাড়াদের দৌরাত্ব শুরু । ফেলে দিয়ে আয় তো ন্যাপা দুটোর ঘেঁটি ধরে!’ ন্যাপার ঠাকুমার খোনা গলার চিৎকার কানে যেতে না যেতেই ‘ঝপাস!’ কে যেন খামচে নিয়ে চুবিয়ে দিলো ড্রেনের জলে । অপমানে চোখে জল এলো, এই দুনিয়ায় ভালো কারো করতে নেই । এতো যে নিঃস্বার্থে পাড়ার দেখাশুনো করি, নাহয় দু চারটে মাছের টুকরো তার বদলে খাজনা ভেবেই নিই, তাবোলে ছিঁচকে বিলে আর আমি এক হলাম!

এর থেকে তো মাছ খাওয়া ছেড়ে দেওয়াই ভালো.................. নাহ্ সেটা বোধহয় পারা যাবে না!



***

শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

গরম ভাতে কাসুন্দি




অফিস টাইমের ভিড়, বাসটা মানুষের চাপে একদিকে হেলে পরেছে । দাদা একটু চাপুন তো!এক মুশকো জোয়ান হাঁকল মহিলা সিটের সামনে একপায়ে ভরে দিয়ে ঝুলে থাকা এক মিহি গোঁফকে । কি ব্যপার এবার কোলে বসবেন নাকি?’ জবরদস্ত মাসিমা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন । দুদিকের হুড়োতে মিহি গোঁফ দিশেহারা, এরপর একেবারে ট্রাপিজের কায়দায় রড ধরে সিলিঙে ঝোলা যায় কিনা ভেবে দেখছেন । এই যে একটু সরে বসুন তো, বাচ্চাটাকে একটু বসতে দিন’; ‘কোথায় সরব আর জায়গা কোথায়?’ ‘কোনার সিটে অমন বেঁকে বসে আছেন আর জায়গা নেই! নিন সোজা হয়ে বসে বাচ্চাটাকে বসতে দিন। কথপোকথন চলছে বছর তিনেকের বাচ্চা কোলে এক অল্পবয়সী মা ও টিপটপ এক কলেজ পড়ুয়া আধুনিকার মধ্যে । আধুনিকা কথা না বাড়িয়ে সামান্য সোজা হয়, তাতে যে ইঞ্চি ছয়েক জায়গা হোল সেখানে বাচ্চা সমেত মা বসলেন বা বলা চলে বসার চেষ্টা চালালেন । ওরে বাবারে, হাঁটুটা একবারে থেঁতলে গেলো, ওইটুকু জায়গায় এতোবড় শরীর নিয়ে কেউ বসে!ফলতঃ এপাশের বউদির আর্তনাদ । এতবড় শরীর বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছেন, আপনার শরীরই বা কম কিসে?’ ‘দেখুন, শরীরের খোঁটা দেবেন না, আমি আপনার খাই না পরি?’ ‘শুরু তো আপনিই করলেন!’ ‘একে জোর করে বসলেন তারওপর ঝগড়া করছেন লজ্জা করে না?’ ‘লজ্জা কেন করবে আপনি আমার শাশুড়ি নাকি?’ ‘ভাগ্যিস নই যা মুখ!’ চোপ, একেবারে চোপ! সকাল সকাল কোথায় একটু শান্তিতে যাব, তা না কাক চিল বসতে দেবে না!অল্পবয়সি মা আর বউদির যুগলবন্দীতে মাসিমার তারানা ।

অ্যাই, কি হচ্ছে সোজা হয়ে দাঁড়ান না, বাড়িতে মা বোন নেই নাকি?’ না কোনও দিদিমণি নয়, ঝাঁকড়া চুল কাঁধে ঝোলা বছর বাইশের এক দাদামনি সুর করে ধমকালেন মুশকোকে । যাচ্চলে, আপনি মা না বোন?’ মুশকোর ঠোঁটে নচ্ছারি হাসি । ছোটলোক!দাদামনি তাঁর অভিধানের সবচেয়ে চোখা গালিটি ঝাড়লেন, মুশকোর হাসি চওড়া হোল ।

দরজার কাছে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন এক লম্বা বেনী দিদিমিনি, ‘একটু ভেতরে ঢুকতে দিন না’, দিদিমণির কাতর আহ্বান যেন রবি ঠাকুরের গান, মনে দোলা দেয় । আপাততঃ অবশ্য বাসটাই এমন দুলিয়ে দিলো যে লম্বাবেনী এক ছাপোষা দাদার একেবারে বুকে; আহা! যেন উত্তম সুচিত্রার এই পথ যদি না শেষ হয়’, অবশ্য ছাপোষা বউদি যদি দৃশ্যটা দেখতেন তাহলে পথের শেষ কোথায় গিয়ে হোত কে জানে! 

তখন থেকে বলছি সোজা হয়ে দাঁড়াতে, তবু হুঁশ নেই? আগে সোজা হয়ে দাঁড়ানো শিখে তবে বাসে উঠবেন, যতোঃসব !’  বাসের দুলুনিতে মিহি গোঁফও মাসিমার পদানত; এক্ষেত্রে অবশ্য প্রতিক্রিয়াটা প্রায় মহিষাসুর দলনী দুর্গার মত। দাদা টিকিট!ঠিক এইসময়ই কন্ডাক্টারের হাঁক মিহিগোঁফকে, ‘ব্যাপারটা কি বাস চালাতে পারেননা ঠিক করে আর টিকিট চাইতে এসেছেন?’ মাসিমার অপমানের ঝালটা পরল কন্ডাক্টারের ওপর । বাস ঠিকই চলছে, আপনার অসুবিধে হয় নেমে ট্যাক্সি করে যানসেও সমান তেরিয়া । কি বাস ঠিক করে চলছে? তখন থেকে ঢিকির ঢিকির যেন গরুর গাড়ী আবার ট্যাক্সি দেখানো?’ এবার সরব হলেন এক গম্ভীর চেহারার মেশোমশায়, আর তাঁর সাথে তাল জুড়ল প্রায় গোটা বাস । যা বলেছেন এই করেই কলকাতাটা একেবারে উচ্ছন্নে গেল । কথায় কথায় ভাড়া বাড়াবে অথচ কাজের বেলায় ফক্কা। বেগতিক দেখে কন্ডাক্টার সরে পরে, আলোচনা মোড় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক । ‘এই যে কদিন পরপর ভার বাড়ানোর স্ট্রাইক এর পেছনে বিরোধীদের চক্রান্ত নেই ভেবেছেন?’ ‘আরে মশাই এ সবই সরকারের কারসাজি, ভোটের আগে ব্যাটাদের হাতে রাখতে চায়’। ‘মোটেই না কেন্দ্রীয় সরকার সব ব্যাপারে হাত উলটে বসে আছে তো রাজ্য সরকারের কি দোষ?’ ‘দেখুন মশাই সব কথায় কেন্দ্রকে টেনে আনবেন না, যতো বাহানাবাজ!’ ‘দেখুন মুখ সামলে, কেন্দ্রের নামে বললে আপনার গায়েই বা লাগছে কেন?’ ‘আপনি মুখ সামলে!’

ডালহৌসি, ডালহৌসি!কন্ডাক্টারের চিল চিৎকার যেন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা; মৌচাকে ঢিল পরার মতই লেগে যায় হুড়োহুড়ি, লক্ষ্য একটাই, তাড়াতাড়ি বাস থেকে নামা । 

***

শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৪

অভিমানিনী



ভোরের আলোয় তার বার্তা পেলাম, যেন ঘুম ভাঙানিয়া গান;
হিমেল দিনের রোদের মতই মায়াময় ।
শব্দের বোনা জালে না দেখা বন্ধুর হৃদয়ের উষ্ণতা;
আমি যে কতো দামী তারই অনাবিল আশ্বাস ।
তবু যে কথা ছিল না লেখা, মনকে নাড়িয়ে গেলো তাই,
নরম জোছনার মত নীরবে চুঁইয়ে পরা অভিমান;
সে আমাকে মনে রাখে শতকাজে প্রতিদিন,
আমি আছি তার নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে ।
আমার না দেখা বন্ধু সুদূর প্রবাসী, আমি ভুলে আছি তাকে বহুদিন । 
ভালবাসা, প্রেম, বন্ধুতা, এসবই আমার আছে জানি,
তবু এমন নীরব অভিমান, এযে অনেক দামী; অভিমানিনী ।।

বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৪

সে আজিকে হোল কতকাল

তিন মহলা বাড়ির উত্তর কোনে ছোট্ট একটা ঘর,
জানলা দিয়ে উঁকি দেয় একচিলতে আকাশ আর প্রাচীন আমগাছ।
ঘরজোড়া টেবিলের দুইপাশে দুটি উজ্জ্বল মুখ,
অভিজাত ঠাকুরদা ঘড়ির শাসন এড়িয়ে সেখানে থেমে গেছে সময়;
ঘড়ির টিকটিক যেন দুরু দুরু হৃদয়ের উন্মুখ ওঠানামা,
নীরব চোখের ভাষা বয়ে নিয়ে যায় আগামী দিনের প্রতিশ্রুতি।
অতীতের সেই প্রতিশ্রুতি আজকের অভ্যস্ত বাস্তব,
সময় আজও আছে থেমে আমাদের দুজনের মাঝে;
আজও আমার কাছে তুমি তেইশের যুবক -
তোমার চোখে আমি উনিশের তন্বী,
তবু জানি, ‘সে আজিকে হোল কতো কাল’।

***

বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৪

কুল না ফুল?


শীতের দুপুরে মেয়েকে সাথে নিয়ে গেছি একজোড়া চটি কিনতে, তা অনেক দেখা দেখি করে একটা বেশ পছন্দ হল; কিন্তু আমার আধুনিকা কিশোরী মেয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল ‘লুক অ্যাট ইয়োর ফিট মাম্মা ইটস নট কুল!’ মেয়েকে গ্রাহ্য না করে জুতোটা কিনে বাইরে এসে মনে হোল কথাটা বোধহয় মিথ্যে নয়, ঠাণ্ডায় এবং অযত্নে আমার চরণ যুগল প্রায় কাকের ঠ্যাং এ পরিণত হয়েছে। কথাটা মাথায় ঘুরছিলো, হঠাৎ রাস্তার মোড়ে একটা ভারি চমকদার বিউটি পার্লার চোখে পরল। ভাবলাম বরং এখান থেকে খানিক পদমার্জনা করিয়ে পায়ের ভোল ফেরাই; তাতে পা দুখানা আমার প্রাণপাতের না হোক অন্ততঃ প্রনিপাতের* যোগ্য তো হবে (প্রসঙ্গতঃ গীতগোবিন্দে কেষ্ট ঠাকুর ‘দেহি পদ পল্লব মুদারম’ বলে শ্রীরাধার চরণে প্রাণটা প্রায় দিয়েই ফেলেছিলেন আর কি)! যেমন ভাবা, আমরা মা মেয়ে ঢুকলাম ভেতরে; ঢুকতেই কাউনটারের মেয়েটি কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই আগে নাম ঠিকানা মোবাইল নম্বর লিখে নিল। প্রথম ধাক্কা সামলে নিজের প্রয়োজনের কথা জানালাম; যাই হোক আর একটি মেয়ে বেশ যত্ন করে ভেতরে নিয়ে বসিয়ে পদসেবা শুরু করল গরম জলের ছ্যাঁকা, নরুনের খোঁচা আর খামচাখামচির মাঝখানে হঠাৎ দেখি এক অতি সুসজ্জিতা মহিলা ভারি আন্তরিক ভাবে আলাপ করতে এলেন। মহিলার চাকচিক্যে আমি তো মোহিত, জানতে পারলাম ইনিই পার্লারের দিদিমণি, মানে মালকিন আর কি। ‘তা ভাই আপনি ফেসিয়াল কোত্থেকে করান আপনার স্কিন কিন্তু খুব ভালো’ ওঁর প্রশংসা বাক্য আমাকে শাড়ীর দোকানের কর্মচারীদের কথা মনে করিয়ে দিল, পৃথিবীতে একমাত্র ওরাই আমাকে ‘ফরসা’ বলে থাকে শাড়ী গছানোর জন্যে। ‘করিনা তাই ভালো আছে’ কথাটা কেমন মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো, তবে মহিলা ওধার দিয়েও গেলেন না। ‘সেকি ফেসিয়াল করেন না, তবে আজই শুরু করুন’। ‘কিন্তু আপনি তো বললেন স্কিন ভালো’ আমার জবাব। ‘আহা হা, এখন ভালো আছে, কিন্তু আচমকা একদিন সকালে উঠে দেখবেন চামড়া একেবারে কুঁচকে গেছে। আর ফেসিয়াল করলে বহুদিন আপনি একই রকম সুন্দরী থাকবেন’, আবার শাড়ী দোকানের কথাটা মনে হোল যা হোক বুড়ো হতে আমার তেমন আপত্তি নেই; আর তাছাড়া আপত্তি করলেই কি আর বুড়ো হওয়া ঠেকানো যাবে? কিন্তু হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে আয়ানায় নিজের কোঁচকান মুখ দেখতে ভালো লাগবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তাই জিজ্ঞসা করলাম ‘তা আপনাদের কিরকম চার্জ টার্জ?’ ‘দেখুন ফেসিয়াল অনেক রকম, তবে আপনার জন্য গোল্ডটাই সবচেয়ে ভালো হবে’। ‘গোল্ড! মানে সোনা?’ আমি তো হতচকিত। ‘হ্যাঁ একেবারে ২৪ ক্যারাট’। ‘নানা সেকি, সোনার তো আজকাল এমন দাম যে নাম মুখে আনতেও ভয় লাগে। গেলো বছর মামাতো ভায়ের বিয়েতেই সোনা দিতে পারিনি আর শেষে কিনা মুখে মেখে নষ্ট করবো’! আঁতকে উঠে বলি। ‘তাহলে এক কাজ করুন আপনি বরং পার্ল ফাসিয়াল করুন, আপনাকে খুব সুট করবে’। ‘পার্ল মানে আপনি মুক্তোর কথা বলছেন? সেটাও নিশ্চয়ই আসল?’ আমার প্রশ্নে দিদিমণি মিষ্টি করে হেসে সায় দিলেন। ‘দেখুন, এক আধ ছড়া মুক্তোর হার আমার আছে বটে কিন্তু সেতো সবই হায়দ্রাবাদী। আসল মুক্ত তো কেবল মিউসিয়ামেই দেখেছি। এতটা বাড়াবাড়ি করা বোধহয় ঠিক হবে না’। ‘বেশ তবে বরং আপনি ফ্রুট ফেসিয়াল করুন, সেই বা মন্দ কি!’ মহিলাকে যত দেখছি ওঁর প্রতি শ্রদ্ধা যেন আমার বেড়ে উঠতে লাগলো। ‘তা ফ্রুট ফাসিয়ালের ব্যাপার টা কি?’ আমি বেশ কৌতহল বোধ করলাম। ছেলে ভোলানো মায়ের স্নেহে দিদিমণি বোঝাতে লাগলেন, ‘দেখুন আঙুর, পেঁপে, বেদানা, এই যে সব ভালো ভালো ফল এই দিয়েই আমাদের ফ্রুট ফেসিয়াল; স্কিনের পক্ষে ভারি ভালো’। ‘সেকি ফলের যা দাম, তা এগুলো মুখে মেখে নষ্ট না করে খেলে ভালো হয় না?’ এতক্ষণে দিদিমণির মাখন গালে একটু বিরক্তির ভাঁজ পরলো, ‘তা আপনার যা বাজেট মনে হচ্ছে তাতে আপনি হারবাল ফেসিয়াল করুন’। ‘সেটা কি রকম?’ আমি এখনো কৌতুহলি। ‘এ হোল গিয়ে শাক সবজি লতা পাতার ব্যাপারযাক তাহলে এটাই আমার পক্ষে ভালো। আজই বাড়ী গিয়ে রান্নাঘরের জিনিষ টিনিষ দিয়ে ব্যাপারটা সেরে ফেলব এখনএতক্ষণে আমি স্বস্তির নিঃশাস ফেলি। তাড়াতাড়ি পদসেবার বিল মিটিয়ে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। দিদিমণিও আঁধার মুখে আমাকে বেড়াল পার করে বাঁচলেন।

মেয়ের মুখ দেখে অনুমান করলাম সে একটুও খুশী নয় আমার ব্যাবহারে। বুঝলাম, ফুল (fool) হতে চাইনি বলে কুল (cool) হওয়া আমার হোলনা!

* যারা আমার মত সেকেলে বুড়ি নয় তাদের সুবিধার্থে জানাই, প্রনিপাত মানে প্রণাম করা; তা আজকাল প্রণামের রেওয়াজ যেমন উঠে গেছে এসব শব্দের প্রয়োজনও তেমন ফুরিয়েছে।

*****
Published in Prothom Alo on 4th April, 2016